হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল প্রস্তাব পর্যালোচনার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম।
জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) কাছে টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল প্রস্তাব জমা দেওয়ার তথ্য প্রকাশের পর বুধবার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন তিনি।
এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা বাংলাদেশের সম্পদ। তাই এই সম্পদের পরিচালনা ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে, সেটিই হওয়া উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
তিনি বলেন, এর আগে পাওয়া প্রস্তাবে তৃতীয় টার্মিনালের নন-অ্যারোনটিক্যাল আয়ের প্রায় ২৩ শতাংশ বাংলাদেশ এবং ৭৭ শতাংশ জাপানি পক্ষ পাওয়ার কথা জানা গিয়েছিল। নতুন প্রস্তাবেও যদি একই ধরনের আয় বণ্টনের হিসাব থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের এত বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ৭৭ শতাংশ আয়ের বিনিময়ে জাপানি পক্ষ কী ধরনের দায়িত্ব ও ব্যয় বহন করবে, তা স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কে বহন করবে—চুক্তিতে এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু তৃতীয় টার্মিনালের আয়-ব্যয়ের হিসাব করলেই হবে না। উন্নত সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক এয়ারলাইন তৃতীয় টার্মিনাল ব্যবহার শুরু করলে বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে সিএএবি যে আয় করছে, তার একটি অংশ কমে যেতে পারে। ফলে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর পুরো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আয়-ব্যয়ে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সেটিও হিসাবের আওতায় নিতে হবে।
এ ছাড়া তৃতীয় টার্মিনালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি অন্য কোনো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ করা হলে সেখান থেকে পাওয়া রয়্যালটি কে পাবে—সিএএবি নাকি জাপানি অপারেটর—তা চুক্তিতে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।
তার মতে, বাংলাদেশ ২৩ শতাংশ আয় পেলেই যে প্রকৃত অর্থে লাভবান হবে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পুরো চুক্তির আর্থিক প্রভাব বিবেচনা করে পাঁচ, ১০ ও ১৫ বছরে বাংলাদেশের মোট আয়-লাভ এবং জাপানি পক্ষের সম্ভাব্য আয় কত হবে, তার একটি পরিষ্কার হিসাব থাকা প্রয়োজন।
এ কারণে একবারে ১৫ বছরের জন্য চুক্তি করা কতটা যৌক্তিক হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট কমিটিকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি। চুক্তির মেয়াদ, আয় বণ্টন ও ভবিষ্যৎ আর্থিক প্রভাব পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হবে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
তবে বিদেশি অংশীদার বা জাপানি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়ার পক্ষে নন এটিএম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জাপানের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। তবে চুক্তির মূল লক্ষ্য হতে হবে বাংলাদেশের সম্পদ থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের আয়কে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা না করে এটি চালু হলে পুরো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সিএএবির মোট আয়-ব্যয়ে কী পরিবর্তন আসবে, সেটিই সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তাবটি সত্যিই ‘Bangladesh First’ নীতি নিশ্চিত করছে কি না—এ প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর খুঁজে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রস্তাব অনুমোদনের আগে দেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ।
