ঢাকা হতে পারে এশিয়ার নতুন ট্রানজিট হাব!

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ ঘন্টা আগে

 

ইউরোপ থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন,পূর্ব ও পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথের কাছাকাছি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। এর সঙ্গে দেশের বড় যাত্রীবাজার এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল যুক্ত হওয়ায় ঢাকাকে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী এয়ারলাইন নেটওয়ার্ক, দ্রুত ট্রানজিট ব্যবস্থা এবং পুরো বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

আন্তর্জাতিক যাত্রীপ্রবাহের দিকে তাকালে সম্ভাবনার আকারটা আরও স্পষ্ট হয়। ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বছরে প্রায় ২ কোটি ২ লাখ এবং জিসিসি ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। ইউরোপ ও চীনের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ এবং জিসিসি ও চীনের মধ্যে প্রায় ৯৭ লাখ যাত্রীর নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এই বিশাল যাত্রীপ্রবাহের একটি অংশকে ঢাকার মাধ্যমে সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মধ্যে যাত্রী চলাচলে সম্ভাবনা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের মধ্যে বছরে প্রায় ২৫ লাখ, কাতার ও চীনের মধ্যে ১৮ লাখ এবং সৌদি আরব ও চীনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। এসব আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের একটি অংশ যদি ঢাকাকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে নতুন একটি বাজার তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বছরে প্রায় সোয়া কোটি যাত্রী পরিবহন করছে। অথচ বিদ্যমান অবকাঠামোর ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। থার্ড টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে শাহজালালের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় আড়াই কোটিতে উন্নীত হওয়ার কথা। ফলে যাত্রী ধারণক্ষমতার দিক থেকে বড় একটি সক্ষমতা তৈরি হবে। তবে কোনো বিমানবন্দরকে ট্রানজিট হাবে পরিণত করার জন্য শুধু এই সক্ষমতা যথেষ্ট নয়।

ট্রানজিট হাবের মূল বিষয় হলো এমন যাত্রী, যাদের চূড়ান্ত গন্তব্য বাংলাদেশ নয়। যেমন মধ্যপ্রাচ্য থেকে একজন যাত্রী ঢাকায় এসে চীন, জাপান কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো গন্তব্যে যাবেন। আবার পূর্ব এশিয়া থেকে আসা একজন যাত্রী ঢাকায় নেমে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইটে উঠবেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ঢাকা হবে তাদের যাত্রাপথের সংযোগস্থল।

এ ধরনের ট্রানজিট ব্যবস্থা কার্যকর করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফ্লাইট সূচির সমন্বয়। একটি ফ্লাইট থেকে নেমে অন্য ফ্লাইটে যাত্রীকে দ্রুত স্থানান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরীক্ষা, ইমিগ্রেশন ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনাও হতে হবে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন। পাশাপাশি রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের সক্ষমতা, পার্কিং স্ট্যান্ড, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ক্যাটারিং এবং অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধাও বাড়াতে হবে। অর্থাৎ শুধু থার্ড টার্মিনাল নয়, পুরো বিমানবন্দর ব্যবস্থাকেই সমন্বিতভাবে পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী এয়ারলাইন নেটওয়ার্ক। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ছিল ২১টি উড়োজাহাজ। ওই সময়ে প্রায় ৩৪ লাখ যাত্রী পরিবহন করলেও শুধু একটি দেশীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব নয়।

তাই বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি ও বেসরকারি এয়ারলাইন্সকে ঢাকায় নতুন রুট এবং বেশি ফ্রিকোয়েন্সিতে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ স্লট বরাদ্দ, দ্রুত রুট অনুমোদন এবং ব্যবসাবান্ধব বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমবর্ধমান যাত্রীবাজার এবং থার্ড টার্মিনালের বাড়তি সক্ষমতা সব মিলিয়ে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হওয়ার একটি সম্ভাবনা বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, প্রয়োজন দ্রুত সংযোগ, শক্তিশালী এয়ারলাইন নেটওয়ার্ক এবং নির্ভরযোগ্য যাত্রীসেবা। এসব নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার আকাশপথে আঞ্চলিক ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

  • শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর