দেশের এভিয়েশন খাতের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্প চালুর প্রস্তুতির মধ্যেই কাস্টমস কার্যক্রম নিয়ে সামনে এসেছে একাধিক ঘাটতি। ঢাকা কাস্টমস হাউসের পরিদর্শনে টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট কার্গো অবকাঠামোয় অন্তত ১৫টি সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। এসব ঘাটতির মধ্যে রয়েছে কাস্টমস হলের জায়গা সংকট, সন্দেহজনক ব্যাগেজ আলাদা ও সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা, গুদামের ঘাটতি এবং পণ্য পরীক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এসব সমস্যা সমাধান না করে টার্মিনাল চালু হলে কাস্টমস কার্যক্রমে বিঘ্নের পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিরোধ, রাজস্ব আদায়, জব্দ পণ্যের নিরাপত্তা এবং যাত্রীসেবায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঢাকা কাস্টমস হাউস ১৬ মার্চ ২০২৬ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে এসব ঘাটতির কথা জানিয়ে চিঠি দেয়। পাঁচ মাসের বেশি সময়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
চিহ্নিত সমস্যার মধ্যে রয়েছে কাস্টমস হলের জায়গা সংকট। টার্মিনালে পিক সময়ে ঘণ্টায় প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার যাত্রী চলাচলের সক্ষমতা থাকলেও কাস্টমস হলের ধারণক্ষমতা ও পরিসর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ছাদ নিচু এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় একসঙ্গে বেশি যাত্রী এলে সেখানে জট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সহকারী ও যুগ্ম কমিশনারদের জন্য পর্যাপ্ত অফিস স্পেস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ব্যাগেজ তল্লাশি ও স্ক্যানিংয়েও রয়েছে একাধিক সীমাবদ্ধতা। স্ক্যানার স্থাপনের ব্যবস্থা থাকলেও অপারেটরদের কাজের জায়গা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিয়ে ঘাটতি রয়েছে। কোনো ব্যাগেজ সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত হলে সেটিকে স্বাভাবিক যাত্রীপ্রবাহ থেকে আলাদা করে পরীক্ষা করার জন্য নির্দিষ্ট পথ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক বা জব্দ ব্যাগেজ নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিয়েও কাস্টমস উদ্বেগ জানিয়েছে।
কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। মূল্যবান ও জব্দ পণ্য রাখার জন্য নির্দিষ্ট নিরাপদ গুদামের ঘাটতি রয়েছে। আমদানি করা পণ্যের কায়িক বা সরাসরি পরীক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কাস্টমসের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বড় আকারের চালান স্ক্যান ও পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগেও কাস্টমস কর্মকর্তারা থার্ড টার্মিনালের কার্গো অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত স্টোরেজ ও ফিজিক্যাল এক্সামিনেশনের জায়গা না থাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
রপ্তানি কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে ঘাটতি। প্রয়োজনীয় স্ক্যানার, যানবাহন স্ক্যানিং এবং জব্দ পণ্য রাখার গুদাম নিয়ে কাস্টমসের চাহিদার সঙ্গে অবকাঠামোর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পণ্য পরীক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও কাস্টমসের পরিদর্শনে উঠে এসেছে। ফলে নতুন টার্মিনালের কার্গো সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে কাস্টমসের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন হলেও দীর্ঘদিন ধরে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ২০২৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর সীমিত পরিসরে টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এরপর ধাপে ধাপে ২০২৭ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে টার্মিনালের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও আলোচনা পুনরায় শুরু হয়েছে।
প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার এই অত্যাধুনিক টার্মিনাল যাত্রী ও কার্গো ব্যবস্থাপনায় দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি করছে। তবে কাস্টমসের প্রয়োজনীয় জায়গা, গুদাম, স্ক্যানিং ও পণ্য পরীক্ষণের অবকাঠামো পর্যাপ্ত না হলে নতুন টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে। তাই টার্মিনাল চালুর আগে চিহ্নিত ঘাটতিগুলোর কতটা সমাধান করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
