সমুদ্রের বুকে রানওয়ে, তবুও আসছে না বিদেশি এয়ারলাইন্স!

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ ঘন্টা আগে

সমুদ্রের নীল জলরাশির কোল ঘেঁষে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ শেষ হয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দরের। আগামী অক্টোবরেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষা। রানওয়ে সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে আধুনিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। তবে এত বড় বিনিয়োগের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে কোন এয়ারলাইন্স?

সরকার কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক রুটের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে আশাবাদী। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো বিদেশি এয়ারলাইন্স কক্সবাজার থেকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে চূড়ান্ত আগ্রহ দেখায়নি। ফলে বিমানবন্দরের অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রয়োজনীয় এয়ারলাইন ও যাত্রী দুই দিকের বাজার কত দ্রুত তৈরি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

কারণ একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাফল্য শুধু বড় রানওয়ে বা আধুনিক টার্মিনালের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক যাত্রী চাহিদা এবং নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায় এয়ারলাইন্সগুলোর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। কক্সবাজারের পর্যটকদের বড় অংশ এখনো দেশীয়। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যাত্রীবাজার এখনো পর্যাপ্তভাবে তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর অনাগ্রহের পাশাপাশি দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর পরিকল্পনাও এখনো সীমিত। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কক্সবাজার থেকে আপাতত ঢাকা হয়ে সপ্তাহে একটি কলকাতা ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাব্যতা যাচাই করলেও সরাসরি আন্তর্জাতিক রুট চালু করা বাণিজ্যিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসেনি।

অবকাঠামোগত দিক থেকে অবশ্য বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে কক্সবাজার বিমানবন্দরে। বঙ্গোপসাগরের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণ করে এর দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৫ বর্গমিটার আয়তনের আন্তর্জাতিক টার্মিনালও প্রস্তুত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবার জন্য টার্মিনালে ডিপার্চারে চারটি এবং অ্যারাইভালে ছয়টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। লাগেজ ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে দুটি ব্যাগেজ ডেলিভারি বেল্ট। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রীসেবা সক্ষমতা ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ১৮ লাখে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ চালু হলে কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। এর ফলে পর্যটন খাতের পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন ও অন্যান্য সেবা খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক যাত্রীর বাজার তৈরি হয় না। বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পর্যটন সুবিধার উন্নয়ন, বিনোদন ও অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক বিমান ভাড়াও নিশ্চিত করতে হবে।

এয়ারলাইন্সগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে পর্যাপ্ত যাত্রী, লাভজনক রুট এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। তাই কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত প্রস্তুতির পাশাপাশি বিদেশি এয়ারলাইন্সকে আকৃষ্ট করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকের চাহিদা তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ও টার্মিনাল আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন সক্ষমতা তৈরি করেছে। কিন্তু অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ও পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত না হলে সেই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে না। তাই অক্টোবরের উদ্বোধনের পর কক্সবাজার থেকে কত দ্রুত নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হয় এবং সেই ফ্লাইটগুলো কতটা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় সেটিই এখন এই মেগা প্রকল্পের বাস্তব সাফল্যের অন্যতম বড় পরীক্ষা।

  • কক্সবাজার বিমানবন্দর