প্রতিদিন বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে গন্তব্যে ছুটে যায় অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। আগে দেশের পুরো আকাশসীমায় নজরদারি নিশ্চিত না থাকায় ওভারফ্লাই ফি আদায়ে সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক রাডার ও নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পর বদলেছে সেই চিত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু বিদেশি উড়োজাহাজের ওভারফ্লাই ফি থেকেই ৮০৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ টাকা ২০ পয়সা রাজস্ব পেয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পুরো আকাশসীমা, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় অংশও এখন রিয়েল-টাইম নজরদারির আওতায় এসেছে অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। ফ্রান্সের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থ্যালসের প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। এরপর নতুন ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
নতুন ব্যবস্থা চালুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওভারফ্লাই ফি থেকে মোট ৮০৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ টাকা ২০ পয়সা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে আয় হয়েছে ৩৮৮ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার ৪৫১ টাকা ২০ পয়সা। পরবর্তী ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৪ হাজার ৯১৪ টাকায়।
প্রথম ছয় মাসে জুলাইয়ে আয় হয়েছে ৪৮ কোটি ১৮ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮৫ টাকা ৩৩ পয়সা। আগস্টে ৪৪ কোটি ৭৫ লাখ ২৭ হাজার ৪৭৮ টাকা ৯৬ পয়সা, সেপ্টেম্বরে ৮৬ কোটি ৬৩ লাখ ৩৮ হাজার ৫১৭ টাকা ৬০ পয়সা, অক্টোবরে ৭৩ কোটি ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮৮ টাকা ৫৯ পয়সা, নভেম্বরে ৬২ কোটি ১১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৫ টাকা ১৪ পয়সা এবং ডিসেম্বরে ৭২ কোটি ৭৬ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩৫ টাকা ৫৮ পয়সা রাজস্ব এসেছে।
পরের ছয় মাসে আয়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮০ কোটি ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৬ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ২২৬ টাকা, মার্চে ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১০৮ টাকা, এপ্রিলে ৬৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৬ টাকা, মে মাসে ৭০ কোটি ৪৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা এবং জুনে ৬৬ কোটি ৯৮ লাখ ৬২ হাজার ৩১৮ টাকা আদায় হয়েছে।
আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলেও আয়ের বৃদ্ধি স্পষ্ট। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভারফ্লাই ফি থেকে আয় ছিল ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১৩ টাকায়। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয় আরও বেড়ে হয় ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ২২৬ টাকা। একই বছরের মার্চে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১০৮ টাকা।
রাজস্ব বৃদ্ধির পেছনে নতুন রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার ভূমিকার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন এস-ব্যান্ড প্রাইমারি সার্ভেল্যান্স রাডারের কভারেজ ৮০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এবং মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডারের কভারেজ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। এর ফলে আগে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের যেসব অংশে নজরদারির সীমাবদ্ধতা ছিল, সেগুলোও এখন পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে।
নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা উড়োজাহাজের রিয়েল-টাইম তথ্য পাচ্ছেন। এতে ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজ শনাক্ত করে প্রযোজ্য ওভারফ্লাই ফি আদায়ের সক্ষমতাও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে আধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা শুধু বাংলাদেশের আকাশসীমার নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করেনি, একই সঙ্গে ওভারফ্লাই ফি থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮০৫ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের পর বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার আর্থিক গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।
