বাংলাদেশের নীল আকাশে ডানা মেলার স্বপ্ন নিয়ে গত তিন দশকে ডজনেরও বেশি বেসরকারি এয়ারলাইন্স যাত্রা শুরু করেছিল। কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, আধুনিক সেবা আর আন্তর্জাতিক রুটে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সবারই। কিন্তু বাস্তবতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে সেই স্বপ্নগুলোর বেশিরভাগই আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। একসময় যারা আকাশে দাপিয়ে বেড়াত, আজ তারা শুধু পরিত্যক্ত বিমান আর বকেয়া দেনার গল্প।
কেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো সে সব এয়ারলাইন্স? সেসব উত্থান-পতনের গল্প জেনে নেওয়া যাক।
জিএমজি এয়ারলাইন্স: ১৯৯৫ সালে অ্যারো বেঙ্গলের নন-শিডিউল ফ্লাইট দিয়ে সূচনা হলেও বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স যুগের প্রকৃত সূচনা হয় ১৯৯৭ সালে ‘জিএমজি এয়ারলাইন্স’-এর মাধ্যমে। দেশের প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে তারা অভ্যন্তরীণ রুট ছাড়িয়ে কলকাতা, কাঠমান্ডু, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, দুবাই ও রিয়াদ পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। বহরে ছিল বোয়িং ৭৬৭ ও এমডি-৮২-এর মতো বড় বিমান।
দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা জিএমজি ২০০৯ সালে নাটকীয়ভাবে আলোচনায় আসে, যখন বেক্সিমকো গ্রুপ প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে এবং সালমান এফ রহমান চেয়ারম্যান হন। এরপরই ২০১০ সালে হঠাৎ করে ৭৯ কোটি টাকা মুনাফা দেখানো হয়, যা মূলত শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। ৩০০ কোটি টাকার প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি হয় ৪০০ শতাংশ প্রিমিয়ামে।
তবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) আর্থিক অনিয়ম ধরে ফেলায় আইপিও বাতিল হয়। বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ ফেরত পাননি। একই সময়ে সোনালী ব্যাংক থেকে বেক্সিমকোর গ্যারান্টিতে নেওয়া ২৪৭ কোটি টাকার ঋণও অনাদায়ী থেকে যায়।
২০১২ সালের ২৮ মার্চ ‘বিজনেস ট্রান্সফরমেশন’-এর অজুহাতে জিএমজি সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পুনরায় ফেরার ঘোষণা থাকলেও এক যুগ পেরিয়ে গেলেও তারা আর আকাশে ফেরেনি।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ: জিএমজির পতনের পর সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল ‘ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ’। ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই এয়ারলাইন্সটি ছিল দেশের একমাত্র শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিমান সংস্থা। ঢাকা থেকে লন্ডন, জেদ্দা, মাসকট, সিঙ্গাপুর ও কুয়ালালামপুরে তাদের নিয়মিত ফ্লাইট ছিল।
কিন্তু পুরনো এমডি-৮৩ ও এটিআর-৭২ বিমানের ওপর নির্ভরশীলতাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটি, শিডিউল বিপর্যয় এবং যাত্রী অসন্তোষ ইউনাইটেডকে বড় ধরনের লোকসানে ফেলে দেয়। ২০১৪ সালের পর থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
রিজেন্ট এয়ারওয়েজ: ২০১০ সালে হাবিব গ্রুপের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করা ‘রিজেন্ট এয়ারওয়েজ’ শুরু থেকেই প্রিমিয়াম সেবার কারণে যাত্রীদের আস্থা অর্জন করেছিল। বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানের বহর নিয়ে তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের পাশাপাশি দোহা, মাসকট, কলকাতা ও সিঙ্গাপুরে ফ্লাইট চালু করে।
তবে কোভিড-১৯ মহামারী রিজেন্টের জন্য হয়ে ওঠে শেষ আঘাত। ২০২০ সালে ফ্লাইট স্থগিত করার পর তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। শত কোটি টাকার দেনা ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২২ সালে তাদের এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (AOC) বাতিল করা হয়।
হারিয়ে যাওয়া আরও কিছু এয়ারলাইন্সের কথা বললে নাম আসবে ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করা ‘বেস্ট এয়ার’ এর কথা। অংশীদারিত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে মাত্র দুই বছরেই, ২০০৯ সালে অপারেশন বন্ধ করতে বাধ্য হয় এয়ারলাইন্সটি।
কেন বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে দেশীয় এয়ারলাইন্স?
বিশেষজ্ঞরা বলছে, যথাযথ ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অভাব, পুরনো বিমান দিয়ে ব্যয়বহুল অপারেশন চালানোর চেষ্টা, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং অতিরিক্ত অ্যারোনটিক্যাল চার্জই দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর পতনের প্রধান কারণ।
