বাংলাদেশের পর্যটন খাতে অবকাঠামো উন্নয়নে ট্যুরিজম রিয়েল এস্টেট ও ক্রাউড ফান্ডিং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন ছুটি গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ তারিক মাহমুদ। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মানসম্মত আবাসন, নিরাপত্তা ও পর্যটনসেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে পর্যটকদের আস্থা ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
দেশের ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ-এর চতুর্থ পর্বে অতিথি হয়ে এসব কথা বলেন তিনি। পডকাস্টে পর্যটন খাত, রিসোর্ট ব্যবসা, পর্যটন অবকাঠামো, ক্রাউড ফান্ডিং, বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, কক্সবাজার ও কুয়াকাটার সম্ভাবনা এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ নিয়ে কথা বলেন তারিক মাহমুদ।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরাঘুরি এবং বিভিন্ন হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা থেকেই ছুটি রিসোর্টের ধারণা তৈরি হয়েছে। গ্রামীণফোনে কর্মজীবনের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণের পাশাপাশি হোটেলগুলোর সেবা, সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থাপনা কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশে মানসম্মত হসপিটালিটি সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ছুটি রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়।
তারিক মাহমুদ বলেন, ছুটি রিসোর্টের শুরু গাজীপুরে। সেখানে দীর্ঘদিন হসপিটালিটি সেবা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের পর দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০২২ সাল থেকে ‘ট্যুরিজম রিয়েল এস্টেট’ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করে ছুটি। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। রিসোর্ট ব্যবসার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু একটি ভবন বা কয়েকটি রুম নির্মাণ করলেই রিসোর্ট হয় না। এর সঙ্গে থাকতে হয় উপযুক্ত ধারণা, স্থাপত্য পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিনোদন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। একটি ভালো রিসোর্টের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, নিরাপত্তা ও আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
রিসোর্ট নিয়ে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ছুটি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, একসময় বাংলাদেশে রিসোর্টকে শুধু প্রেমিক-প্রেমিকাদের ঘোরাঘুরির জায়গা হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। তবে এখন পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও করপোরেট গ্রুপের জন্যও রিসোর্টে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, একজন পর্যটককে প্রথমে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এরপর প্রয়োজন মানসম্মত আবাসন, খাবার, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সেবা। এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে একজন পর্যটক একই গন্তব্যে বারবার যেতে আগ্রহী হবেন।
কক্সবাজারকে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চলগুলোর একটি উল্লেখ করে তারিক মাহমুদ বলেন, সমুদ্র, মেরিন ড্রাইভ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কক্সবাজারে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। বিদেশি জাহাজ ও নাবিকদের আগমন বাড়লে তাঁদের আবাসনের প্রয়োজনও তৈরি হবে।
কুয়াকাটার সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে কুয়াকাটার যোগাযোগব্যবস্থা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে পর্যটন বিকাশে আরও উন্নত সড়ক যোগাযোগ, বিমানবন্দরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। কুয়াকাটায় স্বল্প পরিসরে ভিলা প্রকল্পের মাধ্যমে পর্যটকদের আরামদায়ক আবাসনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
টেকনাফে রিসোর্ট করার পরিকল্পনার বিষয়ে তারিক মাহমুদ বলেন, কক্সবাজার শহরের তুলনায় টেকনাফে তুলনামূলক নিরিবিলি ও ব্যক্তিগত পরিবেশ পাওয়া যায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে পরিবার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতেই সেখানে রিসোর্টের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রিসোর্ট ব্যবসায় ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ধারণা সম্পর্কে তারিক মাহমুদ বলেন, এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি বিনিয়োগ পদ্ধতি। বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ রুম কেনার পরিবর্তে ছোট ছোট অংশে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষেরও পর্যটন রিয়েল এস্টেটে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ছুটির দীর্ঘদিনের কার্যক্রম ও মানুষের আস্থাই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি। যারা দীর্ঘদিন ধরে ছুটি রিসোর্টকে চেনেন এবং এর কার্যক্রম দেখেছেন, তাঁদের অনেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রকল্পে অংশ নিচ্ছেন। প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি দেখার সুযোগও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিনিয়োগকারীদের প্রতি দায়িত্বশীলতার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিনিয়োগকারীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিভিন্ন ছুটি রিসোর্টে তাঁদের আবাসনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশে একটি মাঝারি মানের রিসোর্ট নির্মাণে বিনিয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে তারিক মাহমুদ বলেন, জমি, স্থাপত্য, অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার ওপর মোট ব্যয় নির্ভর করে। একটি পূর্ণাঙ্গ রিসোর্টের জন্য সাধারণত ১০ থেকে ২০ বিঘা জমি প্রয়োজন হতে পারে। একটি রিসোর্ট নির্মাণে গড়ে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে শুধু শখের বশে রিসোর্ট তৈরি করলেই সফল হওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। রিসোর্টকে পেশাদারভাবে পরিচালনা এবং অতিথিদের আরাম, নিরাপত্তা ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পেশাদার ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রিসোর্ট ও হসপিটালিটি খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান তারিক মাহমুদ। তাঁর মতে, দেশে প্রকৃত অর্থে দক্ষ ও পেশাদার হসপিটালিটি জনবল পাওয়া এখনও কঠিন। তবে পর্যটন ও হসপিটালিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে এই জনবল তৈরি করা সম্ভব। দেশে পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি হলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি হসপিটালিটি পেশাজীবীরাও দেশে ফিরে কাজ করার সুযোগ পাবেন বলে মনে করেন তিনি।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে তারিক মাহমুদ বলেন, কক্সবাজারের মতো দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত হারে বিদেশি পর্যটক আসছেন না। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, বিনোদন, নাইটলাইফ, আবাসন ও অন্যান্য পর্যটনসেবা নিশ্চিত করতে না পারা।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে ‘অপার সম্ভাবনাময়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষ করে কক্সবাজার অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
দেশের ভ্রমণ বিষয়ক প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রধম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’।’ চেক ইন বাংলাদেশ’-এর হসপিটালিটি পার্টনার ছুটি ‘রিসোর্ট কক্সবাজার’। পডকাস্টটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন ‘চেক ইন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাঈম আবির। প্রযোজনা করেন মোঃ শাহানুর রহমান মুকুট।
