দেশে একই সঙ্গে পাইলটের সংকট ও বেকারত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ। তাঁর মতে, এয়ারলাইন্সগুলোতে অভিজ্ঞ পাইলটের ঘাটতি থাকলেও কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) পাওয়া অনেক তরুণ পর্যাপ্ত ফ্লাইং আওয়ার না থাকায় চাকরিতে ঢুকতে পারছেন না।
দেশের ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর তৃতীয় পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। পাইলট হওয়ার প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, ফ্লাইং একাডেমির সংকট, এয়ারলাইন্সের সম্প্রসারণ ও বিমানবন্দর অবকাঠামোসহ দেশের এভিয়েশন খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ জানান, বাংলাদেশে পাইলট হতে প্রশিক্ষণে প্রায় ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে অর্থের পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমও প্রয়োজন। নিজের প্রশিক্ষণের সময় প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করার কথাও জানান তিনি। ২৮ বছর বয়সে ফ্লাইং শুরু করে প্রায় দুই বছরের মধ্যে লাইসেন্স অর্জনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন এই পাইলট।
পাইলটদের কর্মজীবনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিয়মিত মেডিকেল পরীক্ষা ও সিমুলেটর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিটি ফ্লাইটের আগে আবহাওয়া, জ্বালানি, বিকল্প বিমানবন্দর ও সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হয়। তাঁর মতে, টেকঅফের চেয়ে ল্যান্ডিং বেশি চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের আবহাওয়াও পাইলটদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নিজের কর্মজীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ জানান, একবার সৈয়দপুর থেকে ঢাকায় আসার সময় ভয়াবহ আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে বিমানটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে মেঘালয়ের দিকে সরে যায় এবং একপর্যায়ে ভারতীয় আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে। পরে ভারতীয় এটিসির রাডার ভেক্টরের সহায়তায় বিমানটি নিরাপদে সিলেট হয়ে ঢাকায় ফিরে আসে। আরেক ঘটনায় হাইড্রলিক প্রেসার কমে গেলে ‘মেডে’ ঘোষণা করে চেকলিস্ট অনুসরণ করে নিরাপদে অবতরণ করার কথাও জানান তিনি।
টার্বুলেন্সকে বিমান চলাচলের স্বাভাবিক অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাইলটরা এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ পান। তাই প্রতিটি টার্বুলেন্সকে ‘মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা’ হিসেবে উপস্থাপন না করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশি পাইলটদের দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই উল্লেখ করে ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বড় এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশি পাইলটরা কাজ করছেন। তবে দেশের ফ্লাইং একাডেমিগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অর্থের অভাব, প্রশিক্ষণ বিমান ও প্রশিক্ষকের সংকট দূর করতে হবে। সিপিএলধারী তরুণদের ইনস্ট্রাক্টর রেটিং নিয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পরামর্শও দেন তিনি।
পাইলট সংকট ও বেকারত্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এয়ারলাইন্সে প্রবেশের জন্য অনেক ক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্লাইং আওয়ার প্রয়োজন হয়। ফলে নতুন সিপিএলধারীদের অনেকেই চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না, অন্যদিকে অভিজ্ঞ পাইলটের স্তরে গিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে। এয়ারলাইন্সগুলোর বহর বাড়লে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইন্স বহন করছে বলেও দাবি করেন ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ। বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নতুন রুট, উন্নত যাত্রীসেবা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি মাত্র রানওয়ের ওপর বড় টার্মিনাল চালু হলে উড়োজাহাজের জট বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় রানওয়েতে অপেক্ষা করতে হলে বিদেশি এয়ারলাইন্স ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি নতুন বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক করার আগে যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
দেশে দুই বা চার আসনের ছোট উড়োজাহাজ দিয়ে ‘এয়ার ট্যাক্সি’ চালুর স্বপ্নের কথাও জানান ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে উবারের মতো আসন বুকিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে এতে দেশের বেকার পাইলটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
পাইলট হতে আগ্রহী তরুণদের প্রথমে মেডিকেল পরীক্ষা করে শারীরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার পর ভালো ফ্লাইং একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এয়ারলাইন্সে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ইনস্ট্রাক্টর রেটিং নিয়ে কাজ করার কথাও বলেন তিনি।
দেশের ভ্রমণবিষয়ক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’। পডকাস্টটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন এভিয়েশন সাংবাদিক নাঈম আবির। প্রযোজনা করছেন মো. শাহানুর রহমান মুকুট।
