বাংলাদেশের আকাশপথে প্রতিদিন শত শত উড়োজাহাজ ওঠানামা করছে। হাজার হাজার যাত্রীর পদচারণায় মুখর দেশের বিমানবন্দরগুলো। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, দেশের পুরো এভিয়েশন খাতই যেন লাভের মুখ দেখছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ বিমানবন্দর এখনও পরিচালিত হচ্ছে লোকসানে, আর সেই ক্ষতির বড় অংশ বহন করছে একটি মাত্র বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর আর্থিক কাঠামো এখনো অনেকটাই এককেন্দ্রিক। দেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শাহজালাল থেকেই আসে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মোট রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। প্রতি বছর কোটি কোটি যাত্রী, বিপুল আন্তর্জাতিক কার্গো পরিবহন, ল্যান্ডিং ও পার্কিং ফি, টার্মিনাল চার্জ, বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া এবং বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম থেকে এই বিপুল আয় হয়।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেলেও তাদের আয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও কার্গো অপারেশন সীমিত থাকায় পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত আয় করতে পারে না এই দুই বিমানবন্দর।
আরও বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যায় দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে। যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী, বরিশাল ও কক্সবাজারের মতো বিমানবন্দরগুলো আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও আর্থিকভাবে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।
রানওয়ে রক্ষণাবেক্ষণ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, জনবল এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পরিচালনায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও রাজস্ব আয় সেই তুলনায় অনেক কম। ফলে এসব বিমানবন্দর পরিচালনায় প্রতিবছর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয় বেবিচককে।
লোকসানের তালিকায় রয়েছে বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা কয়েকটি বিমানবন্দরও। ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট ও শমশেরনগরে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট না থাকলেও নিরাপত্তা, জমি রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ, আয় না থাকলেও ব্যয় বন্ধ হয়নি।
তবে এই চিত্রের মধ্যে ব্যতিক্রম কুমিল্লা বিমানবন্দর। সেখানে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট না থাকলেও স্থাপিত নেভিগেশন ও এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজকে সেবা দেওয়া হয়। ফলে বিমান না নামলেও এই অবকাঠামো থেকে রাজস্ব অর্জিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দেশের বিমানযাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। আগামী দশকে যাত্রীসংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন শুধু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর নির্ভর করে পুরো দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না।
তাই এখনই ঢাকার বাইরে বিমানবন্দরগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, কার্গো অপারেশন, এমআরও সুবিধা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে এসব বিমানবন্দরকে আয়মুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
অন্যথায়, দেশের বিমানবন্দর নেটওয়ার্কের বর্তমান বাস্তবতা অপরিবর্তিতই থাকবে একটি বিমানবন্দর আয় করবে, আর সেই আয় দিয়েই বছরের পর বছর চলবে দেশের বাকি বিমানবন্দরগুলোর লোকসানের বোঝা।
