বিমানের রাজত্ব ভেঙে জিএমজির উত্থান, পতন হলো যেভাবে

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ ঘন্টা আগে

এক সময় বাংলাদেশের আকাশে নতুন সম্ভাবনার নাম ছিল জিএমজি এয়ারলাইন্স। যখন দেশের আকাশপথ কার্যত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একক আধিপত্যে পরিচালিত হতো, তখন বেসরকারি খাত থেকে সাহসী এক উদ্যোগ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জিএমজি। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের এভিয়েশন খাতের ইতিহাস বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে সেটিই হারিয়ে যায় আকাশ থেকে। কী ছিল সেই উত্থান আর পতনের গল্প?

১৯৯৮ সালের ৬ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ রুটে প্রথম ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে জিএমজি এয়ারলাইন্স। জিএমজি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশনের হাত ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যাত্রীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। সময়নিষ্ঠতা, তুলনামূলক উন্নত সেবা এবং নতুন ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কারণে দ্রুতই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এয়ারলাইন্সটি।

দেশীয় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ফ্লাইট চালুর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আকাশপথে প্রবেশ করে জিএমজি। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, কাঠমান্ডু এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। অনেকের কাছেই তখন জিএমজি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি এয়ারলাইন্স।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে বেক্সিমকো গ্রুপ। বড় কর্পোরেট বিনিয়োগ যুক্ত হওয়ায় তখন ধারণা করা হচ্ছিল, জিএমজি হয়তো বাংলাদেশের আকাশে একটি শক্তিশালী এভিয়েশন জায়ান্টে পরিণত হবে। কিন্তু সাফল্যের এই অধ্যায়ের আড়ালেই তৈরি হচ্ছিল ভবিষ্যতের সংকট।

আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে জিএমজি বহরে যুক্ত করে বোয়িং ৭৪৭-৩০০ উড়োজাহাজ। কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পুরোনো প্রযুক্তির চার ইঞ্জিনের এই উড়োজাহাজ পরিচালনার উচ্চ ব্যয় প্রতিষ্ঠানটির ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ তৈরি করে। আধুনিক ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী উড়োজাহাজের যুগে বোয়িং ৭৪৭-৩০০ পরিচালনা করা ক্রমেই অলাভজনক হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে যখন লোকসান সামাল দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝায় জড়িয়ে পড়ে। ব্যাংকঋণ, পরিচালন ব্যয় এবং বিভিন্ন বকেয়া মিলিয়ে আর্থিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, এয়ারলাইন্সটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সংকট মোকাবিলায় শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও তা বিতর্কের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালের ৩০ মার্চ ‘পুনর্গঠন ও নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনার’ কথা উল্লেখ করে জিএমজি এয়ারলাইন্স তাদের সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।

তখন অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, হয়তো নতুন রূপে আবারও আকাশে ফিরবে জিএমজি। কিন্তু সেই সাময়িক বিরতিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী বিদায়ে পরিণত হয়।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়ে থাকা তাদের উড়োজাহাজগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের প্রতীকে। একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একক আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, সেই জিএমজি এয়ারলাইন্সের গল্প শেষ হয় আর্থিক সংকট, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে।

তবে জিএমজির গল্প শুধু একটি এয়ারলাইন্সের পতনের ইতিহাস নয়। এটি বাংলাদেশের বেসরকারি এভিয়েশন খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ, আকাশ জয় করতে শুধু বড় স্বপ্নই যথেষ্ট নয় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আর্থিক শৃঙ্খলা, সঠিক বহর ব্যবস্থাপনা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা।

আজও বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ইতিহাসে জিএমজি এয়ারলাইন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। কারণ, তারাই প্রথম দেখিয়েছিল বাংলাদেশের আকাশে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সের বাইরে অন্য কারও উড়ারও সুযোগ আছে।

  • জিএমজি এয়ারলাইন্স