বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে দেশব্যাপী একটি সমন্বিত ‘জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি এভিয়েশন উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে এই গ্রিডের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অব্যবহৃত ও বন্ধ এয়ারস্ট্রিপগুলোকে পুনরায় চালু করে বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ আকাশপথ নেটওয়ার্ক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ৩টি আন্তর্জাতিক ও ৫টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রয়েছে। এর ফলে দেশের অনেক প্রান্তিক অঞ্চল এখনও সরাসরি আকাশপথের সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্ধ বা অচল হয়ে থাকা আঞ্চলিক এয়ারস্ট্রিপগুলোকে আধুনিকায়ন করে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি নতুন অভ্যন্তরীণ রুট চালুর সুযোগ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে একটি সমন্বিত আকাশপথ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, শমশেরনগর ও লালমনিরহাটের মতো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কয়েকটি আঞ্চলিক বা স্বল্প দূরত্বের বিমানবন্দরকে নতুন করে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিমানবন্দর চালু হলে ড্যাশ-৮ বা এটিআর-৭২-এর মতো টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ দিয়ে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। বর্তমানে সড়কপথে যেখানে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে আকাশপথে তা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটে নামিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু যাত্রী পরিবহনকে দ্রুত করবে না, বরং দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে প্রধান শহর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর সংযোগও আরও শক্তিশালী করবে। এতে ব্যবসা, পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং জরুরি যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর পাশাপাশি কক্সবাজার, সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীকে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গেও এই গ্রিডকে যুক্ত করা হবে। ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ের একজন যাত্রী নিজ এলাকার বিমানবন্দর থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রধান আন্তর্জাতিক হাবে পৌঁছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী আকাশপথ ব্যবহার করেন। জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩ কোটির বেশি হতে পারে। এতে দেশের বিমান পরিবহন খাত আরও বিস্তৃত হবে এবং রাজধানীকেন্দ্রিক যোগাযোগ নির্ভরতা কমে আসবে।
সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে বরাদ্দের একটি অংশ এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে ব্যয় করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশেও এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
