এভিয়েশন রিপোর্টিংয়ে সেন্সেশনের ফাঁদ

লেখক: নাঈম আবির
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে

একবার শতাধিক যাত্রী নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করা একটি ফ্লাইটের ঘটনা নিয়ে যখন চারপাশে “নায়কোচিত ল্যান্ডিং”, “মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা” আর “অলৌকিক রক্ষা” এই ধরনের শিরোনাম ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলার।

নম্বর জোগাড় করতে সময় লাগলোনা। ফোন করার মুহূর্তে আমার মাথায়ও একই চিত্র। একজন পাইলট, যিনি শতাধিক জীবন আকাশ থেকে নিরাপদে ফিরিয়েছেন, সম্ভবত কোনো নাটকীয় অভিজ্ঞতা শোনাবেন। ফোন রিসিভ হলো। পরিচয় দেওয়ার পর বললাম, “আপনি তো সত্যিই অসাধারণ একটা কাজ করেছেন। সবাই আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চায়। ত্রুটি ধরা পড়ার মুহূর্তে প্রথম কী ভাবনা ছিল? ল্যান্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন? ককপিটে তখন কী চলছিল?”

ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি বললেন “ব্রাদার, ইটস পার্ট অব আওয়ার জব। নাথিং সিরিয়াস। প্লেনের অনেক কিছুই অটোপাইলটে চলে। আমরা শুধু চেকলিস্ট ফলো করি। টেকঅফ আর ল্যান্ডিংটাই আমাদের মূল কাজ। আমি শুধু আমার কাজটাই করেছি।” এই কথাটি আমার প্রত্যাশিত পুরো গল্পকে বদলে দেয়।

যে ঘটনাকে বাইরে থেকে “বীরত্ব” হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার প্রতিটি ক্লিপ “অল্পের জন্য বেঁচে ফেরা” হিসেবে ছড়াচ্ছে, সেই একই ঘটনা পাইলটের কাছে কোনো আবেগের বিষয় নয় বরং একটি প্রক্রিয়া। পরে আরও কয়েকজন সিনিয়র পাইলটের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সবার বক্তব্য প্রায় একই ধরনের। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তারা নিয়মিত সিমুলেটরে প্রশিক্ষণ নেন। অনেক সময় বাস্তব ফ্লাইটের চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি তারা সিমুলেশনে বহুবার অনুশীলন করেন। একজন পাইলট আমাকে বলেছিলেন, “ইমার্জেন্সি আমাদের কাছে আতঙ্ক নয়, এটি একটি চেকলিস্ট ফলো করার প্রসেস।” অর্থাৎ পুরো বিষয়টি আবেগ বা বীরত্বের চেয়ে বেশি নির্ভর করে সিস্টেম, ট্রেনিং এবং প্রটোকলের ওপর। এখান থেকেই প্রশ্নটা উঠে, এভিয়েশন নিয়ে আমরা যারা কাজ করি তারা কী আসলেই এভিয়েশন সেফটির বাস্তবতা বুঝি, নাকি শুধু দৃশ্যমান ঘটনাটিই দেখি?

বিমান চলাচলে “জরুরি অবতরণ” কোনো বিরল ঘটনা নয়। এটি একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেশনাল প্রক্রিয়া। কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, সিস্টেম অ্যালার্ট বা অপারেশনাল ঝুঁকি দেখা দিলে উড়োজাহাজকে নিরাপদে নিকটবর্তী বিমানবন্দরে নামানো হয় এটাই নিয়ম। এই সিদ্ধান্ত এককভাবে কোনো ব্যক্তির নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ককপিট ক্রু, কেবিন ক্রু, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এয়ারলাইন্স অপারেশন সেন্টার। কিন্তু এই জটিল সিস্টেমের জায়গায় যখন শুধু একজন “নায়ক পাইলট”-এর গল্প তৈরি হয়, তখন পুরো বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়।

গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় একটি সফল সেফ ল্যান্ডিংকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন যাত্রীরা মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছেন। শিরোনাম হয় “অলৌকিক রক্ষা”, “বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা”, বা “পাইলটের দক্ষতায় প্রাণ রক্ষা”। এমন ভাষা আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় হলেও সমস্যাটি গভীর। এটি একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করে, অন্যদিকে এভিয়েশন সেফটির প্রকৃত কাঠামোকে সরলীকরণ করে ফেলে। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয়, যেন বিমান ভ্রমণ সবসময়ই একটি উচ্চঝুঁকির বিষয়।

বর্তমানে সাংবাদিকতা এবং কনটেন্ট সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেন্সেশন তৈরি না করে সঠিক ব্যাখ্যা দেয়া। বিশেষ করে এভিয়েশনের মতো টেকনিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে ভুল ভাষা ব্যবহার শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, বরং একটি পুরো শিল্প সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে। আমরা যদি ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংকে “অলৌকিক রক্ষা” না ভেবে “সিস্টেমের সফলতা” হিসেবে দেখি, তাহলে হয়তো আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে যাত্রীদের ভয়ও কমবে, বোঝাপড়াও বাড়বে।

লেখকঃ নাঈম আবির; এভিয়েশন রিপোর্টার

  • travel based first digital media
  • জরুরি অবতরণ
  • নাঈম আবির
  • ভ্রমণ বিষয়ক প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া