বাংলাদেশে আসার পর একজন বিদেশি পর্যটকের ভোগান্তি শুরু হয় বিমানবন্দর থেকেই এমন মন্তব্য করেছেন দেশের জনপ্রিয় ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালাহউদ্দিন সুমন। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে লাগেজের জন্য অপেক্ষা, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর যানজটসহ নানা কারণে একজন পর্যটকের বাংলাদেশ ভ্রমণের প্রথম অভিজ্ঞতাই অস্বস্তিকর হয়ে উঠে। তাই বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে দ্রুত ই-ভিসা চালু, বিমানবন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
দেশের ভ্রমণ বিষয়ক প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এর ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’এর সপ্তম পর্বে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। পডকাস্টে বিমানবন্দর, ইমিগ্রেশন, পর্যটন অবকাঠামো, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, ভিসা ব্যবস্থা, পর্যটন ব্র্যান্ডিং, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং দেশের এভিয়েশন খাতসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
সালাহউদ্দিন সুমন বলেন, ব্যাংকক থেকে ঢাকায় উড়োজাহাজে আসতে যেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় লাগে, সেখানে বিমানবন্দর থেকে বাসায় পৌঁছাতে অনেক সময় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। তাঁর মতে, একটি দেশের বিমানবন্দর শুধু যাত্রী আসা-যাওয়ার স্থান নয়; এটি দেশের প্রবেশদ্বার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে পর্যটন উন্নয়নের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। তিনি বলেন, কোনো দেশের পর্যটন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পর সেই দেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ হতে হবে। এ কারণে যত দ্রুত সম্ভব বিদেশি পর্যটকদের জন্য ই-ভিসা চালু করার দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, ভ্রমণকারীর জন্য বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়া যত সহজ ও দ্রুত করা যাবে, আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা তত সহজ হবে।
বাংলাদেশের পর্যটনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন সুমন বলেন, পাহাড়, সমুদ্র, নদী, সুন্দরবন, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, গ্রামীণ জীবন, খাবার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। তবে এসব সম্পদ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতি অনেক সময় বন্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার মতো নেতিবাচক বিষয়কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। এর বিপরীতে দেশের ইতিবাচক ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্পদ আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
উত্তরাঞ্চলের শীতকালীন প্রকৃতি, সরিষাক্ষেত, গ্রামীণ জীবন, বরিশালের খাল, ভাসমান পেয়ারা বাজার, বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার, লোকসংগীত ও স্থানীয় সংস্কৃতির মতো বিষয় বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। সুন্দরবন, রাঙামাটি, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন ও কুয়াকাটাসহ সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে মানসম্মত ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার ভিডিও কনটেন্ট তৈরির পরামর্শ দেন তিনি। নির্দিষ্ট দেশের দর্শকদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি অর্থায়নে এসব কনটেন্ট প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্যুরিজম বোর্ডের সাথে ট্রাভেল কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন সালাহউদ্দিন সুমন। তিনি বলেন, ট্রাভেল কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য তাঁদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করার উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায় না। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে বাংলাদেশের পর্যটন তুলে ধরার ক্ষেত্রে কনটেন্ট নির্মাতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
পডকাস্টে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে অব্যবস্থাপনাকে উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন সুমন। কক্সবাজারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি হলেও সৈকত ও আশপাশের এলাকার ব্যবস্থাপনা এখনও পুরোপুরি পর্যটকবান্ধব নয়। বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় বিনোদন, নিরাপদ পরিবেশ, ওয়াশরুম, পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ও সেবা ব্যবস্থাপনা উন্নত করা প্রয়োজন। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেই আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, যোগাযোগ, আবাসন ও বিনোদনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
সেন্ট মার্টিনের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন সুমন বলেন, দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের বাদ না দিয়ে তাঁদের সম্পৃক্ত করে একটি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, স্থানীয় মানুষের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে সাজানো, রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয়দের পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা গেলে সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্য আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
বিমানবন্দর ও এভিয়েশন খাতকে পর্যটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন সুমন বলেন, বিমানবন্দর একটি দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও দেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করার সুযোগ রাখে। তাঁর মতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিমানের মতো কারিগরি প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাদারদের গুরুত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর সম্প্রসারণকেও এভিয়েশন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লে অন্য উদ্যোক্তারাও এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারেন।
দেশের ভ্রমণবিষয়ক ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’। পডকাস্টটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাঈম আবির। প্রযোজনা করেন মো. শাহানুর রহমান মুকুট।
