হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ২০২৪ সালের অক্টোবরেই চালু করা সম্ভব ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান। তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকলে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই সময়ের মধ্যেই টার্মিনালটির অপারেশন শুরু করা সম্ভব হতো।
দেশের ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর ষষ্ঠ পর্বে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন মফিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে থার্ড টার্মিনালের নির্মাণ ও অপারেশনাল প্রস্তুতি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রানওয়ে সক্ষমতা, প্রকল্প ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ বিমানবন্দর পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি।
মফিদুর রহমান বলেন, তিনি দায়িত্ব ছাড়ার সময় থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছিল। অবকাঠামোগত কাজের পাশাপাশি টার্মিনালটি চালুর জন্য অপারেশনাল প্রস্তুতিরও পরিকল্পনা ছিল। সেটি বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৪ সালের অক্টোবরেই টার্মিনাল থেকে বিমান চলাচল শুরু করা সম্ভব ছিল।
থার্ড টার্মিনাল চালুর বিলম্বের পেছনে অপারেশন রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার বা ওরাট কার্যক্রমের জটিলতার কথাও উল্লেখ করেন সাবেক এই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, টার্মিনালের যন্ত্রপাতি ও সিস্টেম বুঝে নিয়ে সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম প্রস্তুতের কাজ দ্রুত করা প্রয়োজন ছিল। ওরাট কার্যক্রমে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।
মফিদুর রহমানের ভাষ্য, শুরুতে ওরাটের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব থাকলেও পরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পরিমাণ কমিয়ে তা প্রায় ৮০ কোটি টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এত বড় একটি বিমানবন্দর প্রকল্পের তুলনায় এ ব্যয় খুব বড় ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়েও দীর্ঘদিন সিদ্ধান্তহীনতা ছিল বলে জানান মফিদুর রহমান। তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া থাকলে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারত।
তবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মূল বিষয় হওয়া উচিত সেবার মান, সক্ষমতা ও রাজস্ব নিশ্চিত করা। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করা হবে, সেটি পরিচালনাকারীর বিষয়; বেবিচকের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রয়োজনীয় সেবার মান ও কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করা।
থার্ড টার্মিনালের আয় ভাগাভাগির প্রসঙ্গে মফিদুর রহমান বলেন, রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ পাওয়ার চেয়ে মোট রাজস্ব কত বাড়ানো যাচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, মোট আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো গেলে ২৭ শতাংশ রাজস্ব অংশীদারত্বও কার্যকর হতে পারে। তবে আয় বাড়ানো না গেলে শুধু বেশি শতাংশ রাজস্ব পাওয়াতেও বেবিচকের বড় সুফল হবে না।
থার্ড টার্মিনালের সঙ্গে দ্বিতীয় রানওয়ে না থাকাকে শাহজালাল বিমানবন্দরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, একটি রানওয়ে দিয়েও বিশ্বের অনেক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালিত হচ্ছে। তবে এতে অপারেশনাল ও জরুরি পরিস্থিতিতে ঝুঁকি থাকে। এ কারণে তাঁর দায়িত্বকালে ঢাকার বিমানবন্দরের জন্য দ্বিতীয় রানওয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করা হয়েছিল। মফিদুর রহমান বলেন, দ্বিতীয় একটি স্বাধীন রানওয়ে নির্মাণের জন্য বর্তমানে প্রয়োজনীয় জায়গা নেই। তবে নির্ভরশীল রানওয়ে ব্যবস্থার সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হয়েছিল। একটি রানওয়ে কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে শাহজালাল বিমানবন্দরের সব ফ্লাইটের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একক রানওয়ের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে দ্রুত বিমান সরিয়ে নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ে, নতুন অ্যাপ্রোন, পার্কিং বে ও বোর্ডিং ব্রিজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এসব অবকাঠামোর পাশাপাশি এয়ার ট্রাফিক ও গ্রাউন্ড ম্যানেজমেন্টের দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়েও সতর্ক করেন মফিদুর রহমান। তাঁর মতে, বর্তমান বিমানবন্দরকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহার করা গেলেও ভবিষ্যতে ঢাকার বাইরে নতুন একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর প্রয়োজন হবে। ২০৩৫ সালের পর বর্তমান বিমানবন্দরের সক্ষমতা ও আশপাশের নগরায়ণের কারণে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি। নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু রানওয়ে ও টার্মিনাল নয়, সড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন, পর্যটন, হসপিটালিটি ও অন্যান্য সেবাকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বেবিচকের সংস্কারের ক্ষেত্রে দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন মফিদুর রহমান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মানের এভিয়েশন সংস্থা হিসেবে বেবিচককে পরিচালনা করতে হলে জনবল, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে। থার্ড টার্মিনালকে নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে মফিদুর রহমান বলেন, এত বড় একটি মেগা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিতে পেরে তিনি গর্বিত। তবে দায়িত্ব ছাড়ার আগে টার্মিনালটি চালু করে যেতে না পারাকে নিজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের ভ্রমণ বিষয়ক ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন চেক ইন এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাঈম আবির। ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর হসপিটালিটি পার্টনার ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার।
