সরকারের অগ্রাধিকারে পর্যটন নেই: আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ ঘন্টা আগে

বাংলাদেশে পর্যটন খাত সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সরকারের সাবেক সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের। তাঁর মতে, পর্যটন উন্নয়নে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবলের ঘাটতি, ভিসা জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

দেশের ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর অষ্টম পর্বে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। পডকাস্টে ট্যুরিজম বোর্ডে তাঁর ছয় বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা, পর্যটন খাতের সংকট, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ, পর্যটন মহাপরিকল্পনা, সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার, সুন্দরবন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি।

আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের বলেন, শুধু বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে পর্যটন খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ খাতের সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে না পারলে পর্যটনের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ সম্ভব হবে না।

ট্যুরিজম বোর্ডে দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবেক এই সিইও বলেন, ২০১৯ সালে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতেন না। দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্যুরিজম বোর্ডকে পরিচিত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি। কোভিডের সময় অনলাইনে দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ৬৪ জেলার মধ্যে প্রায় ৫০টি জেলা এবং সাতটি উপজেলার সঙ্গে এ ধরনের বৈঠক করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে বাজেট ও জনবলের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন জাবের। তাঁর মতে, দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের দায়িত্ব ট্যুরিজম বোর্ডকে দেওয়া হলেও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সবসময় দেওয়া হয়নি।

তিনি জানান, ট্যুরিজম বোর্ডের মাঠপর্যায়ে নিজস্ব অফিস না থাকায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি অর্থ ছাড়াই স্থানীয় উদ্যোগে কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে। তাঁর দাবি, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পর্যটন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও অনুমোদন ও নীতিগত জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশের বড় সংকট হিসেবে ভিসা জটিলতা, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামোর অভাব, খাবার ও আবাসনের উচ্চমূল্য, দুর্বল গণপরিবহন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় বাংলাদেশের সীমিত উপস্থিতির কথা তুলে ধরেন সাবেক এই সিইও। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ই-ভিসা চালু এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার বৈধ ভিসাধারীদের বাংলাদেশে ভিসামুক্ত প্রবেশ বা অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করেন।

পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়াকে নিজের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা পর্যটন মহাপরিকল্পনার কাজ ২০২৩ সালে শেষ হয়। তবে এটি জাতীয় পর্যটন পরিষদে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘মাস্টার প্ল্যানটা আমি শেষ করে আসতে পারিনি। এটা আমার খুব আক্ষেপের জায়গা। আমি অনেক খেটেছি। সারারাত অফিসে থেকেছি, আমার সহকর্মীরাও সারারাত কাজ করেছেন।’

সেন্টমার্টিনের পর্যটন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে জাবের বলেন, দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটন সীমিত রাখা প্রয়োজন। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, ট্যুর অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আগের সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সেন্টমার্টিন বন্ধের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন একই ভবনে থাকলেও তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয় নেই। এ ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি ‘ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে থাকতে পারে এবং পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থাকে এর সদস্য করা যেতে পারে।

কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার মধ্যে দায়িত্ব ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। অপরিকল্পিত হোটেল নির্মাণ এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যটকদের পরিবেশবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষিত গাইড ছাড়া পর্যটকদের বনে প্রবেশ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও হিসেবে নিজের সবচেয়ে বড় সফলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ট্যুরিজম বোর্ডকে সাধারণভাবে পরিচিত করানো।’ পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের ট্যুরিজম বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগকেও সফলতা হিসেবে উল্লেখ করেন। আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে তিনি অংশীজনদের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারার কথা বলেন। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে পর্যটন খাতের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা বাস্তবায়নে কাজ করার কথাও জানান তিনি।

দেশের ভ্রমণ বিষয়ক ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’। পডকাস্টটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন চেক ইন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাঈম আবির। ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর হসপিটালিটি পার্টনার ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার।

  • travel based first digital media
  • ট্যুরিজম বোর্ড
  • পর্যটন
  • পলিসি পডকাস্ট
  • ভ্রমণ বিষয়ক প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া