পাকিস্তানের এয়ারলাইন্স বিক্রি, ভারত-বাংলাদেশ কী করবে?

লেখক: শাহানুর রহমান মুকুট
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

উপমহাদেশের তিন দেশ—পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ। ভূ-রাজনীতির মতোই তাদের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সগুলোর অবস্থানও ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। কোথাও জাতীয় বিমান সংস্থা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ঋণের বোঝায়, কোথাও আবার বিপুল বিনিয়োগে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। আর এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

একসময় এশিয়ার আকাশের রাজা, আজ সংকটের মুখে

একসময় এশিয়ার আকাশে নেতৃত্ব দেওয়া পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) আজ কার্যত ইতিহাসের অংশ। রাজনীতি, দুর্নীতি ও দীর্ঘদিনের অপব্যবস্থাপনার ফলে প্রতিষ্ঠানটি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত ভুয়া পাইলট লাইসেন্স কেলেঙ্কারি পিআইএ-এর সুনামকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পিআইএ-এর ঋণের পরিমাণ একসময় ৮০০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি ছাড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত ও দেশের অর্থনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার জাতীয় এই এয়ারলাইন্সটি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। সম্প্রতি ঐতিহাসিক এই সংস্থাটি বিক্রি করে দেওয়া হয়, যা পাকিস্তানের জন্য এক প্রতীকী অধ্যায়ের সমাপ্তি।

এয়ার ইন্ডিয়া: ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জাগরণের চেষ্টা

পাকিস্তানের বিপরীতে ভারতের জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার গল্পে রয়েছে পালাবদলের আভাস। টাটা গ্রুপের হাতে যাওয়ার আগে এয়ার ইন্ডিয়ার অবস্থাও ছিল শোচনীয়। দীর্ঘদিন লোকসানে চলা এই সংস্থাটি প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি রুপি ক্ষতির মুখে পড়ছিল। পরিষেবার মান, বহরের অবস্থা এবং যাত্রী আস্থার সংকট এয়ার ইন্ডিয়াকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছিল।

২০২২ সালে টাটা গ্রুপের কাছে হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই টাটা গ্রুপ বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে মোট ৪৭০টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিনিয়োগকে এভিয়েশন খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ । ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে পাকিস্তান তাদের আকাশসীমা ভারতীয় বিমানের জন্য বন্ধ রাখায় ইউরোপ ও আমেরিকাগামী ফ্লাইটগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি ফ্লাইটে সময় বাড়ছে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, বাড়ছে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য অতীতে ভারত সরকারকে ক্ষতিপূরণের দাবিও জানিয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়া।

‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’: লাভের রেকর্ড, ঋণের প্রশ্ন

ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ বিমানের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্স ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৯৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা সংস্থাটির ৫৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ, যার মধ্যে ১৯টিই নিজস্ব। আধুনিক ড্রিমলাইনারসহ বহরের গড় ব্যবহার এবং প্রায় ৮২ শতাংশ কেবিন ফ্যাক্টর নিয়ে বিমান আপাতদৃষ্টিতে উড়ছে সাফল্যের আকাশে।

এদিকে বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাংলাদেশ বিমান আবারও বোয়িংয়ের ওপর আস্থা রাখতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

তবে সাফল্যের এই চিত্রের আড়ালে রয়েছে বড় অঙ্কের বকেয়ার প্রশ্ন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল পাওনার তুলনায় সারচার্জ ও জরিমানার অঙ্কই প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

ভিন্ন পথে এশিয়ার তিন দেশ

পাকিস্তান তাদের জাতীয় বিমান সংস্থাকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি, ভারত ঘুরে দাঁড়াতে বাজি ধরেছে বিশাল বিনিয়োগে, আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে লাভ ও দায়, এই দুই বিপরীত সমীকরণের মাঝে। উপমহাদেশের আকাশপথে তিন ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ারের এই ভিন্ন বাস্তবতা ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন মানচিত্রকে নতুনভাবে প্রভাবিত করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

  • এয়ার ইন্ডিয়া
  • পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স
  • বিমান বাংলাদেশে এয়ারলাইন্স
  • বেবিচক