দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে সর্ববৃহৎ বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৭ সালে একসঙ্গে ২১টি নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ যুক্ত করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ১ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এ বিনিয়োগ দেশের বেসরকারি এভিয়েশন খাতে অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে পাঠানো ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি এয়ারক্রাফট লিজিং প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন উড়োজাহাজগুলো সংগ্রহ করা হবে।
ইউএস-বাংলা জানিয়েছে, নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে এয়ারলাইন্সটি।
এ বহর সম্প্রসারণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে আগামী ২৯ জুলাই রাজধানীর শেরাটন ঢাকায় বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট লিজিং প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিমান ও পর্যটন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।
নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন শুধু ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ নয়, বরং দেশের এভিয়েশন খাতে একটি যুগান্তকারী বিনিয়োগ বলছে ইউএস-বাংলা।
এভিয়েশন ও বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “এটি বাংলাদেশের এভিয়েশন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। দেশের কোনো সরকারি বা বেসরকারি এয়ারলাইন্স এর আগে একসঙ্গে এত বড় পরিসরে বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়নি। এটি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বড় সফলতা। তারা নিশ্চয়ই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। আমার বিশ্বাস, এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পর্যটন শিল্প, রপ্তানি ও বিনিয়োগ আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনায় বিপুলসংখ্যক পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার ও সহায়ক জনবলের প্রয়োজন হবে, যা দেশে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।”
বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকাশপথের বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইন্স পরিচালনা করায় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশি ক্যারিয়ারের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ২১টি উড়োজাহাজ পরিচালনায় বিপুলসংখ্যক পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মী, ডিসপ্যাচার ও অন্যান্য কারিগরি জনবল প্রয়োজন হবে। ফলে এভিয়েশন খাতে হাজারো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং তরুণদের জন্য পাইলট ও এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স প্রকৌশলী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও বাড়বে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, “ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে এত বড় বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং এটি বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বাড়বে এবং যাত্রীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে একসঙ্গে এতগুলো এয়ারক্রাফট পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে কোন রুটে কী ধরনের চাহিদা রয়েছে এবং সেই চাহিদা অনুযায়ী কোন সাইজের এয়ারক্রাফট পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ জরুরি। সঠিক রুট পরিকল্পনা ও উপযুক্ত এয়ারক্রাফট নির্বাচন করা গেলে এই বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে এবং দেশের এভিয়েশন খাত আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।”
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বের মাত্র পাঁচটি এয়ারলাইন্স এক বছরে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার নজির গড়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৭ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করে ইউএস-বাংলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
যাত্রীসেবায়ও বড় পরিবর্তন আনছে ইউএস-বাংলা। নতুন উড়োজাহাজগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের কেবিন ইন্টেরিয়র, প্রিমিয়াম আসন, ওয়্যারলেস ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম এবং ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই সুবিধা থাকবে। এর ফলে যাত্রীরা নিজেদের স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে আকাশে ভ্রমণের সময়ই বিনোদন উপভোগের পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহার, বার্তা আদান-প্রদান এবং ফোন কল করার সুবিধা পাবেন। বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে এটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
