অনিশ্চয়তায় ভারত-বাংলাদেশ আকাশপথ, নতুন সম্ভাবনা করাচি?

লেখক: শাহানুর রহমান মুকুট
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ঢাকা ও কলকাতার আকাশসীমায় শুরু হয়েছিল নিয়মিত বিমান চলাচল। গত পাঁচ দশকে সেই যোগাযোগ ক্রমেই বিস্তৃত হয়। চিকিৎসা, পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রয়োজনে ভারত ছিল বাংলাদেশিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিদেশি গন্তব্যগুলোর একটি। ঢাকা থেকে কলকাতা, দিল্লি ও চেন্নাই এই রুটগুলোতে ছিল নিত্যদিনের ব্যস্ততা। একসময় ঢাকা–কলকাতা রুটকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম আকাশপথ হিসেবেও উল্লেখ করা হতো।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনে বাংলাদেশ–ভারত আকাশযোগাযোগ এখন সবচেয়ে সংকুচিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। একই বছরের শেষ দিকে যাত্রী সংকটে দেশের বেসরকারি বিমানসংস্থা নভোএয়ার তাদের ঢাকা–কলকাতা ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বড় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস–বাংলাও চট্টগ্রাম–কলকাতা রুট বাতিল করে। সে সময় এয়ারলাইন্সগুলো ধারণা করেছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটলে যাত্রী প্রবাহ আবার স্বাভাবিক হবে।

কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসে দেখা যাচ্ছে সেই প্রত্যাশা বাস্তব হয়নি। প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বদলে আরও অবনতি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ–ভারত ফ্লাইট সংখ্যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

একসময় ইউএস–বাংলা এয়ারলাইন্স ঢাকা–কলকাতা রুটে সপ্তাহে ২১টিরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করত। বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে সপ্তাহে মাত্র চার দিনে। চিকিৎসা গন্তব্য হিসেবে পরিচিত চেন্নাই রুটেও তাদের ফ্লাইট সীমিত হয়ে সপ্তাহে তিন দিনে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অবস্থাও ভিন্ন নয়। আগে ঢাকা–কলকাতা রুটে দিনে দুটি ফ্লাইট চালানো হলেও বর্তমানে সপ্তাহে মোট সাতটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে যা গড়ে দিনে একটি। দিল্লি রুটে ফ্লাইট চলছে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এবং চেন্নাই রুটে দুই দিন।

যাত্রী সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় ভবিষ্যতে ফ্লাইট সংখ্যা আরও কমানো বা কোনো কোনো রুট পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ভিসা জটিলতা, দীর্ঘদিন ধরে টুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা আবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের কড়াকড়িকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব কারণে সাধারণ যাত্রীরা ক্রমেই ভারতমুখী ভ্রমণ থেকে সরে যাচ্ছেন।

তবে একই সময়ে আঞ্চলিক ভূ–রাজনীতিতে ভিন্ন এক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে আকাশপথ সংকুচিত হলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় বহু বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি চলছে।

জানা গেছে, এই রুটটি পরিচালনা করবে খোদ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। পাশাপাশি পাকিস্তান ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ব্যবসায়িক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ঢাকা থেকে করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন খাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এক সময় বাংলাদেশের আকাশপথ যেখানে প্রায় একচেটিয়াভাবে ভারতমুখী ছিল ২০২৫ সালে এসে তা নতুন গন্তব্যের সন্ধান করছে। একদিকে অবিশ্বাস ও ভিসা জটিলতায় ঢাকা–কলকাতা রুট সংকুচিত হচ্ছে,অন্যদিকে নতুন সম্ভাবনায় ডানা মেলছে ঢাকা–করাচি রুট। এই পরিবর্তন সাময়িক নাকি আঞ্চলিক সম্পর্কের এই উত্থান–পতন দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  • ঢাকা-করাচি রুট
  • বাংলাদেশ-ভারত আকাশপথ
  • বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স