সমুদ্রের ঢেউয়ের আদলে নকশা, ঝিনুকের আকৃতির ছাদ আর আধুনিক যাত্রীসেবা, সব মিলিয়ে নতুন রূপ পেয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। পর্যটন নগরীর এই বিমানবন্দরে গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের মাধ্যমে ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আপাতত অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের সেবা দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করেই নির্মাণ করা হয়েছে টার্মিনালটি।
প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন টার্মিনালটির আয়তন ১৭ হাজার ৯৫৫ বর্গমিটার। এর ফলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ২০ লাখে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে বিমানবন্দরটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫৪টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করছে। নতুন টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে এই সংখ্যা আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক, এর মধ্যে চারটি বহির্গমন এবং ছয়টি আগমন কাউন্টার। আগমন ও বহির্গমন যাত্রীদের জন্য রয়েছে পৃথক লাউঞ্জ। দ্রুত লাগেজ সংগ্রহের জন্য স্থাপন করা হয়েছে দুটি ব্যাগেজ ক্লেইম বেল্ট। যাত্রীদের চলাচলের সুবিধায় রয়েছে চারটি এসকেলেটর ও ছয়টি লিফট। পাশাপাশি রয়েছে বোর্ডিং ব্রিজ, ডিউটি-ফ্রি শপ এবং ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে আধুনিক ব্যবস্থা। টার্মিনালে রয়েছে সাতটি সিকিউরিটি স্ক্যানার, মেটাল ডিটেকশন ব্যবস্থা, হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্রিনিং এবং ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধা। পুরো টার্মিনালজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম। যাত্রীদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহনের সুবিধায় রয়েছে ৩৫টি ভিআইপি এবং ৯০টি সাধারণ গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থা।
টার্মিনালের পাশাপাশি উড়োজাহাজ পরিচালনার অবকাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ট্যাক্সিওয়ে এবং ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রন। এই অ্যাপ্রনে একই সময়ে দুটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ পার্ক করার সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সেবাগুলো প্রস্তুত করার কাজ চলছে। এর ফলে ঢাকা হয়ে নয়, সরাসরি বিদেশি গন্তব্যের সঙ্গে কক্সবাজারের আকাশপথে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংযোগ চালু হলে কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকদের সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যটন, হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন ও ব্যবসা খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন টার্মিনাল, সম্প্রসারিত রানওয়ে এবং আধুনিক যাত্রীসেবা—সব মিলিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের পর্যটন ও এভিয়েশন খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। তবে আন্তর্জাতিক রুট কত দ্রুত চালু হবে এবং নতুন অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, সেটিই এখন বড় বিষয়।
