ভাঙাচোরা তিন বিমানেই কাঁপন ধরে পাকিস্তানের

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

মাত্র তিনটি পুরোনো ও বেসামরিক বিমান, কয়েকজন সাহসী টেকনিশিয়ান আর ৯ জন অদম্য পাইলট নিয়েই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শক্তিশালী বিমান বাহিনীকে কার্যত হতভম্ব করে দিয়েছিল বাংলাদেশের আকাশযোদ্ধারা। যাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বলা হয় ‘অপারেশন কিলো ফ্লাইট’।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার মুখে যখন স্থলপথে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছিল মুক্তিবাহিনী, তখন বাংলার আকাশে কোন প্রতিরোধ গড়তে পারেনি বাঙালিরা। সেসময় বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধবিমান ছিল না, ছিল না আকাশ প্রতিরক্ষার কোনো ব্যবস্থা। এমন বাস্তবতায় আকাশপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় একদল সাহসী বিমান কর্মকর্তা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসাররা তখন চরম দ্বন্দ্বে ছিলেন। একদিকে মাতৃভূমির ওপর হামলা, অন্যদিকে নিজেদের বন্দিদশা। দেশমাতৃকার টানে তারা পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেন। পরে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারের নেতৃত্বে এই আকাশযোদ্ধারা একত্রিত হন। যুদ্ধবিমান না থাকায় ভারতের কাছে সহায়তা চাওয়া হলেও আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে ভারত সরাসরি যুদ্ধবিমান দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে, ঘন জঙ্গলে ঘেরা একটি পরিত্যক্ত রানওয়েতে গোপনে জন্ম নেয় বাংলাদেশের বিমান বাহিনী। এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘কিলো ফ্লাইট’।

এই কিলো ফ্লাইটের বহরে ছিল মাত্র তিনটি বিমান একটি ডিএইচসি-৩ অটার, একটি ডিসি-৩ ডাকোটা এবং একটি অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার। এগুলোর কোনোটিই যুদ্ধবিমান ছিলো না। অটার ও ডাকোটা ছিল পরিবহন বিমান, আর অ্যালুয়েট ছিল সাধারণ হেলিকপ্টার।

তবে বাঙালি টেকনিশিয়ানদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় এসব বেসামরিক বিমানকেই রূপ দেওয়া হয় মরণঘাতী অস্ত্রে। অটার বিমানের ডানার নিচে বসানো হয় রকেট পড। হেলিকপ্টারের নিচে ঝালাই করে লাগানো হয় এক ইঞ্চি পুরু স্টিল প্লেট, যাতে নিচ থেকে গুলি এলে পাইলটদের ক্ষতি না হয়, পাশাপাশি যুক্ত করা হয় মেশিনগান। সবচেয়ে অভিনব ছিল ডাকোটা বিমানের ব্যবহার এর মেঝের কাঠ কেটে একটি গর্ত করা হয়, যেখান দিয়ে হাত দিয়ে ঠেলে বোমা ফেলা হতো। পাইলট সংকেত দিলে একজন অফিসার ম্যানুয়ালি বোমাটি নিচে ফেলতেন।

৫৮ জন প্রাক্তন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সদস্য এবং ৯ জন পাইলট মিলে প্রস্তুত হন এক অসম যুদ্ধের জন্য। দিনের আলোতে পাকিস্তানের আধুনিক ‘স্যাবার জেট’ এর মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আক্রমণ হবে শুধুই রাতে।

সে অনুযায়ী ডিমাপুরের জঙ্গলে শুরু হয় কঠোর প্রশিক্ষণ। রাডার ফাঁকি দিতে গাছের মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়তে হয়। আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ছাড়াই কেবল কম্পাস ও হাতঘড়ির ওপর নির্ভর করে রাতের অন্ধকারে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার অনুশীলন চলতে থাকে। প্রতিটি মুহূর্তই ছিল মৃত্যুর ঝুঁকিতে ভরা, তবুও কেউ পিছু হটেননি।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পাকিস্তানের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির তেলের ডিপো। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার নিয়ে নারায়ণগঞ্জে আক্রমণ চালান। অন্যদিকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম ও ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ অটার বিমান নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হামলা চালান চট্টগ্রামে।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম। রকেটের আঘাতে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনীর তেলের ডিপো। এতটাই নিখুঁত ছিল এই হামলা যে পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমে ভেবেছিল ভারতীয় আধুনিক যুদ্ধবিমান এ আক্রমণ চালিয়েছে। তারা কল্পনাও করতে পারেনি, ভাঙাচোরা এই বেসামরিক বিমান দিয়েই বাঙালিরা এমন ভয়াবহ আঘাত হানতে পারে।

৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কিলো ফ্লাইট মোট প্রায় ৯০টি অপারেশন এবং ৪০টি যুদ্ধ মিশন পরিচালনা করে অদম্য পাইলটরা। এসব অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রসদ সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এরপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হলে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে সবার আগে অবতরণ করে কিলো ফ্লাইটের সেই ঐতিহাসিক অটার বিমানটি।

  • অপারেশন কিলো ফ্লাইট