হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনাল চালু হলে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে আর কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তিতে এমন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত পুরোনো দুটি টার্মিনালের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সীমিত করার এই শর্ত নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আপত্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন টার্মিনাল চালু হওয়ার পর প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহার করা যাবে না। তবে আগে থেকেই চালু থাকা দুটি টার্মিনালের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা। তাঁদের মতে, নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ার কথা। সে ক্ষেত্রে পুরোনো টার্মিনাল দুটি আন্তর্জাতিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। অন্যদিকে নির্মাণাধীন থার্ড টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ১ কোটি ২০ লাখ। ফলে তিনটি টার্মিনালই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে ব্যবহার করা গেলে বিমানবন্দরের মোট বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা দুই কোটিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নতুন টার্মিনাল চালুর পর পুরোনো দুটি টার্মিনাল আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য ব্যবহার করা না গেলে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অবকাঠামোর বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকার আশঙ্কা তৈরি হবে।
অবশ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শর্তের কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। এসব টার্মিনালের কার্যক্রম অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, টার্মিনালগুলোর অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা চালু থাকলেও সেখান থেকে আন্তর্জাতিক রুটের কোনো ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না।
তবে যাত্রীর সংখ্যার হিসাবে শুধু অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে পুরোনো টার্মিনালগুলোর সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ২০২৫ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে যাতায়াত করেছেন প্রায় ২৪ লাখ ১১ হাজার যাত্রী। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ যাত্রী অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করেছেন। একই সময়ে আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াত করেছেন ১ কোটি ৩ লাখের বেশি যাত্রী। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ যাত্রীর তুলনায় আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা চার গুণেরও বেশি। ফলে পুরোনো দুটি টার্মিনাল শুধু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহার করা হলে সেগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এতে অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়তে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পুরোনো টার্মিনালগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে যাত্রীসেবা, এয়ারলাইনস পরিচালনা, বাণিজ্যিক কার্যক্রমসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত থেকে আয় করার সুযোগ সীমিত হবে। অথচ থার্ড টার্মিনালের পাশাপাশি পুরোনো দুটি টার্মিনালও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহার করা গেলে বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারত।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তিতে এমন শর্ত যুক্ত করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নতুন টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার স্বার্থে রাষ্ট্রের বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত দেশের দীর্ঘমেয়াদি এভিয়েশন পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
থার্ড টার্মিনাল চালু হলে দেশের বিমান চলাচল খাতে যাত্রীসেবা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত পুরোনো অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিচালনা চুক্তির শর্তগুলো দেশের স্বার্থ, বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং আর্থিক সম্ভাবনা বিবেচনায় পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
