পঞ্চগড় থেকে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের পটভূমিতে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের দুর্লভ ছবি তুলেছেন ওয়াইল্ডলাইফ ও নেচার ফটোগ্রাফার ফিরোজ আল সাবাহ্। প্রায় সাত বছরের অপেক্ষা, অনুসন্ধান ও নিরলস প্রচেষ্টার পর কাঙ্ক্ষিত সেই ছবি তুলতে পেরে উচ্ছ্বসিত এই আলোকচিত্রী।
বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, আমগাছ, বাঁশঝাড়, টিনের ঘর আর খড়ের গাদার চিরচেনা গ্রামীণ দৃশ্য। আর সেই গ্রামের আকাশসীমায় দৃশ্যমান পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। প্রকৃতির এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন ফিরোজ আল সাবাহ্।
নেপাল ও চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সীমান্তে অবস্থিত ৮ হাজার ৮৪৮ দশমিক ৮৬ মিটার উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টকে পঞ্চগড় থেকে দৃশ্যমান অবস্থায় ক্যামেরায় ধারণ করা ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। অবশেষে অনুকূল আবহাওয়া, স্বচ্ছ আকাশ ও উপযুক্ত অবস্থানের সমন্বয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
ফিরোজ আল সাবাহ্ জানান, ২০১৭-১৮ সালের দিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মাউন্ট এভারেস্ট দেখার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। গাণিতিক হিসাব-নিকাশ ও ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে তিনি বুঝতে পারেন, বিশেষ আবহাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে এভারেস্ট দেখা সম্ভব।
২০১৯ সালে প্রথমবার এভারেস্টের ছবি তোলার চেষ্টা করেন তিনি। তবে ছবিটির সত্যতা ও পরিচয় প্রমাণ করা কঠিন ছিল। এরপর থেকে প্রায় সাত বছর ধরে চলে তাঁর এভারেস্ট দেখার ও ছবি তোলার অভিযান। ২০২২ সালে ভূমিতে দাঁড়িয়ে এভারেস্ট দেখার পাশাপাশি ছবি তুলতেও সক্ষম হন তিনি।
তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের পরিচিত দৃশ্যের সঙ্গে একই ফ্রেমে মাউন্ট এভারেস্টকে ধারণ করা। এ জন্য বছরের পর বছর পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থান ঘুরে উপযুক্ত অবস্থান খুঁজেছেন তিনি।
ফিরোজের ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাস এলেই তাঁর দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আসে। প্রায় দুই মাস ধরে আবহাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকতে হয়। এভারেস্ট বছরে মাত্র কয়েক দিন ভালোভাবে দৃশ্যমান হওয়ায় সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে উপস্থিত থাকা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এবার সেই লক্ষ্য পূরণে গত এক মাসে টানা ১৪ দিন ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে বের হয়েছেন তিনি। কুয়াশা, শিশির আর শীতের সকাল উপেক্ষা করে ঘুরেছেন পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা। কখনো চায়ের দোকানের বেঞ্চে, কখনো গাছের নিচে অপেক্ষা করেছেন কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের আশায়।
অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত সকাল। ফিরোজ জানান, ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা সোনালি আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আকাশ ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও ছিল কম। দূরের পাহাড়ের ঘরবাড়ি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ আকাশের দিগন্তে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মাউন্ট এভারেস্ট।
সেই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে ছিলেন তুষার নামের এক সহযোগী। তিনি ক্যামেরায় ভিডিও ধারণের পরামর্শ দেন। কিন্তু বহুদিনের স্বপ্নের ছবি তোলার উত্তেজনায় ফিরোজ দ্রুত ক্যামেরার সেটিংস পরীক্ষা করে শাটার চাপতে শুরু করেন। একটানা ছবি তুলতে থাকেন যতক্ষণ না ক্যামেরার বাফার পূর্ণ হয়।
ফিরোজের বর্ণনায়, এভারেস্টের পূর্বদিকের কাংশুং ফেস বা ইস্ট ফেস সেদিন তাঁর দৃষ্টিসীমায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মাউন্ট মাকালু ও চামলাং পর্বতের ছবিও ধারণ করেন তিনি।
সাত বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত ছবি তুলতে পারার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, সেই মুহূর্তের আনন্দ ও আবেগ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ছবি তোলার পর দীর্ঘক্ষণ ধানক্ষেতের আইলে বসে প্রকৃতির সেই বিরল দৃশ্য উপভোগ করেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরে ফিরোজ আল সাবাহ্ জানান, ছবিটি তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্ন তৈরি হলেও তিনি চান, মানুষ বিষয়টি নিয়ে জানুক, পড়ুক এবং কৌতূহলী হোক।
তিনি আরও জানান, তাঁর উদ্দেশ্য কখনোই আলোচনায় আসা নয়। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্য ক্যামেরায় ধরে রাখা এবং সেই অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই তাঁর আনন্দের জায়গা।
বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দূরের পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গকে গ্রামীণ বাংলার আবহে ক্যামেরাবন্দি করার এই অভিজ্ঞতা ফিরোজ আল সাবাহর কাছে শুধু একটি আলোকচিত্র নয়; এটি সাত বছরের অধ্যবসায়, প্রকৃতিপ্রেম ও এক অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।
পঞ্চগড়ের ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের শিখরে সূর্যের আলো পড়ার সেই মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রেখে ফিরোজ যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন প্রকৃতির বিস্ময় কখনো কখনো আমাদের খুব কাছ থেকেও দেখা দিতে পারে।
