উত্তরাঞ্চলের মানুষের দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বগুড়া বিমানবন্দরকে বড় পরিসরে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা নয়, বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামোতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটি পিপিপি মডেলে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর বিমানবন্দরটির উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক কাঠামো নির্ধারণে বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। পরামর্শকের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান, পেভমেন্ট ডিজাইন এবং নতুন যাত্রী টার্মিনাল ভবনের বিস্তারিত নকশা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নিট বর্তমান মূল্য, ব্যয়-লাভ অনুপাত এবং অভ্যন্তরীণ মুনাফার হারও নির্ধারণ করা হবে।
নতুন পরিকল্পনায় বড় আকারের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগী করে বিমানবন্দরটি গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এজন্য বিদ্যমান রানওয়ে সম্প্রসারণ করে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ফুটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনার একটি অংশে প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর ৯ হাজার ফুট দীর্ঘ ও ১৫০ ফুট প্রশস্ত রানওয়ে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ১০ হাজার ফুটে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
রানওয়ের পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে নতুন ট্যাক্সিওয়ে ও বড় পরিসরের অ্যাপ্রোন। গড়ে তোলা হবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন যাত্রী টার্মিনাল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সাইট উন্নয়ন অবকাঠামো। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার আওতায় ভূসংস্থানিক জরিপ, মাটির গুণাগুণ অনুসন্ধান, বিদ্যমান অবকাঠামোর লেআউট, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং আর্থিক বিশ্লেষণও করা হবে। একই সঙ্গে বেসামরিক ও সামরিক বিমান চলাচলের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এবং ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা তৈরির কথা রয়েছে।
তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে জমি অধিগ্রহণ। নতুন রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বর্তমান ১০৯ একর জমির বাইরে আরও প্রায় ৭০০ একর জমি প্রয়োজন হতে পারে। এই জমির মধ্যে স্থানীয় বসতবাড়ি ও কৃষিজমি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে বলে নথিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বগুড়া বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দরে উন্নীত করার বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর প্রকল্প নিয়ে নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয় এবং বিমান মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রী সরেজমিন বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেন।
বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে শুধু বগুড়া নয়, পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জের মানুষেরও বিমান যোগাযোগের সুযোগ বাড়বে।
উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিমান যোগাযোগ বাড়লে কৃষিপণ্য ও সতেজ সবজি দ্রুত পরিবহন এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি শিল্প স্থাপন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
তবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণসহ কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ধাপ পেরোতে হবে। এখন মূল প্রশ্ন, এসব প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ করে বগুড়া বিমানবন্দরকে বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হয়।
