২৮ সেপ্টেম্বর চালু হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত টার্মিনাল

লেখক: রাইসুল ইসলাম
প্রকাশ: ৮ ঘন্টা আগে

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত টার্মিনাল আগামী সপ্তাহ থেকে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য চালু হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অক্টোবর থেকে এই বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হবে।

বুধবার কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রস্তুতি পরিদর্শনে গিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন টার্মিনাল দিয়েই অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিমানবন্দরে বর্তমানে যেসব দেশীয় এয়ারলাইনস চলাচল করছে, তারা নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

প্রাথমিকভাবে উড়োজাহাজ থেকে টার্মিনাল ভবনে যাত্রী আনা-নেওয়ার জন্য গলফ কার্ট ব্যবহার করা হবে বলেও জানান বেবিচক চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম শুরুর পর আগামী মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে।

নভোএয়ারের মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের পরিচালক সোহেল মাজিদ জানান, নতুন টার্মিনাল থেকে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের জন্য গলফ কার্টও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করে সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করেছে এয়ারলাইনটি।

আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হচ্ছে বিমানবন্দর

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছে। এর অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল এবং বঙ্গোপসাগরের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেবিচক বাস্তবায়ন করছে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম। এর লক্ষ্য কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তোলা।

বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস ও প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিমানবন্দরে একটি হাইব্রিড টার্মিনাল ব্যবস্থা চালু করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন—দুই কার্যক্রমই নতুন টার্মিনাল দিয়ে পরিচালিত হবে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ আগমনকারী যাত্রীরা পুরোনো টার্মিনাল ব্যবহার করবেন। অভ্যন্তরীণ বহির্গামী যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন সম্পন্ন করে পরে পুরোনো টার্মিনালে গিয়ে বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষা করবেন।

১৭,৯৫৬ বর্গমিটারের নতুন টার্মিনাল

প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালটি নির্মাণে অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

টার্মিনালে রয়েছে ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ধারণক্ষমতার ডিপারচার লাউঞ্জ, ডিউটি-ফ্রি শপ, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং আগমন লাউঞ্জ।

বহির্গামী যাত্রীদের জন্য চারটি এবং আগত যাত্রীদের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার স্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের লাগেজ সরবরাহের জন্য রয়েছে দুটি ব্যাগেজ ডেলিভারি বেল্ট।

এ ছাড়া টার্মিনালে পাবলিক অ্যাড্রেস (পিএ) সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম (এফআইডিএস), সাইনেজ, সিসিটিভি এবং ভারী হাতব্যাগ স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সম্প্রসারণের পর বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করে রানওয়ে সম্প্রসারণ

কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রানওয়ে সম্প্রসারণ। ৯ হাজার ফুটের রানওয়ে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে, যা বর্তমানে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে।

রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য বেড়েছে ১ হাজার ৭০০ ফুট।

সম্প্রসারিত রানওয়েতে পূর্ণ বোঝাই অবস্থায় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০-এর মতো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারবে।

রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চীনের যৌথ উদ্যোগ সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।

প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রের দিকে প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং এবং নিরাপদ উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য ক্যাট-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রানওয়েকে সুরক্ষায় নির্মাণ করা হয়েছে ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ। পাশাপাশি নিরাপত্তা বেষ্টনী, টহল সড়ক এবং ৮ হাজার ১৪৯ মিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে।

বাড়বে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বিনিয়োগ

বর্তমানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর কক্সবাজারে প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কার্যক্রম শুরু হলে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটক আগমন বাড়বে বলে আশা করছে সরকার। একই সঙ্গে কক্সবাজারে হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগও বাড়তে পারে।

বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের উপযোগী করে তুলতে প্রয়োজনীয় মান যাচাইয়ের পর ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর সনদও পেয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর।

  • কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
  • বিমানবন্দর
  • সর্বশেষ