আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি জোরদার করছে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স এয়ার অ্যাস্ট্রা। আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ বহরে প্রথম বোয়িং ৭৩৭ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। উড়োজাহাজটি বহরে আসার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে মে মাসেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরুর আশা করছেন এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ।
দেশের ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর পঞ্চম পর্বে অংশ নিয়ে তিনি এয়ার অ্যাস্ট্রার সম্প্রসারণ, দেশের এভিয়েশন খাত, জ্বালানি মূল্য, বিমানবন্দর অবকাঠামো, তৃতীয় টার্মিনাল, অভ্যন্তরীণ বাজার ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে কথা বলেন।
ইমরান আসিফ জানান, প্রথম বোয়িং ৭৩৭ যুক্ত হওয়ার পর একই বছর আরও চারটি বোয়িং ৭৩৭ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে এয়ার অ্যাস্ট্রার বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টিতে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রুটের প্রথম গন্তব্য হিসেবে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে বিবেচনা করছে এয়ার অ্যাস্ট্রা। কোন রুটটি আগে চালু হবে তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও সিঙ্গাপুর দিয়ে দ্রুত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু করার আগ্রহের কথা জানান তিনি।
এদিকে এটিআর ৭২-৬০০ উড়োজাহাজ দিয়ে কলকাতা, কাঠমান্ডু ও পোখারা রুটেও ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে এয়ার অ্যাস্ট্রার। চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন তিনটি ব্র্যান্ড নিউ এটিআর ৭২-৬০০ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সিডিউল নির্ভরযোগ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে এয়ারলাইন্সটির।
নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার কারণ হিসেবে যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণজনিত সিডিউল বিঘ্ন কমানোর কথা বলেন ইমরান আসিফ। তাঁর মতে, ব্র্যান্ড নিউ উড়োজাহাজে প্রথম কয়েক বছর বড় ধরনের নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন তুলনামূলক কম থাকে। ফলে ফ্লাইট পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়।
পডকাস্টে ইমরান আসিফ বলেন, বাংলাদেশে এয়ারলাইন্স পরিচালনা এমনিতেই কঠিন। তবে নীতি ও বাস্তবায়নের কিছু অসামঞ্জস্যের কারণে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে কোনো যৌক্তিক সুবিধা দেওয়া হলে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। জ্বালানি, বকেয়া পরিশোধ, বন্ডেড স্পেসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের এয়ারলাইন্স খাত আরও লাভজনক ও টেকসই হতে পারে।
ইমরান আসিফ জানান, এয়ার অ্যাস্ট্রা, ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ার—এই তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব এয়ারলাইন্স অসম প্রতিযোগিতার কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সেই কর্মসংস্থান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এয়ারলাইন্স ব্যবসার সবচেয়ে বড় ব্যয় হিসেবে জেট ফুয়েলের দামকে উল্লেখ করেন ইমরান আসিফ। তাঁর মতে, মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি জ্বালানিতে চলে যায়। আগে দীর্ঘ সময় পরপর জেট ফুয়েলের দাম সমন্বয় করা হলেও এখন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে আগের তুলনায় ব্যবস্থা বেশি কার্যকর হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ইমরান আসিফ বলেন, কক্সবাজারে বর্তমানে সর্বনিম্ন ভাড়া প্রায় ৪ হাজার টাকা থেকে শুরু হলেও জ্বালানির বাড়তি খরচ পুরোপুরি ভাড়ায় সমন্বয় করতে গেলে তা ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় উঠে যেতে পারে। এতে যাত্রী কমে যাবে এবং এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লিট সম্প্রসারণ ও কানেক্টিভিটি তৈরির পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হবে।
শুধু অভ্যন্তরীণ রুট পরিচালনা করে একটি এয়ারলাইন্সকে টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বর্তমান বাজারে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ডোমেস্টিক অপারেশনে লোকসান বহন করতে হয়। আন্তর্জাতিক রুট চালুর পর বিভিন্ন রুট ও অপারেশনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হলে অর্থনীতির পরিসর কাজে লাগিয়ে আগের লোকসান ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বন্ধ থাকা বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ইমরান আসিফ বলেন, শুধু বিমানবন্দর খুলে দিলেই হবে না, এর সঙ্গে নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন। ছোট বিমানবন্দরগুলোতে কম যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে এয়ারলাইন্সের খরচ না উঠলে সরকারকে কর, ল্যান্ডিং ও পার্কিং ফি কমানোসহ বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দিতে হবে।
ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ছোট শহরের বিমানবন্দরগুলোতে সরকারি সহায়তার মাধ্যমে বিমান যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতিগত সুবিধা দিলে বগুড়া, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, শমশেরনগর, ঈশ্বরদী ও খুলনার মতো বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা আরও বাস্তবসম্মত হতে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে ইমরান আসিফ বলেন, শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলেই বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়বে না। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, দক্ষ জনবল, রানওয়ে, র্যাম্প ও এয়ারসাইড ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর সক্ষমতা একসঙ্গে বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। প্রতিযোগিতামূলক দামে পর্যাপ্ত জেট ফুয়েল সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ঢাকাকে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
দেশের ভ্রমণ বিষয়ক প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’। পডকাস্টটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন ‘চেক ইন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) নাঈম আবির। প্রযোজনা করেন মোঃ শাহানুর রহমান মুকুট। ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর হসপিটালিটি পার্টনার ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার।
