হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্রমেই বাড়ছে যাত্রী ও ফ্লাইটের চাপ। টার্মিনালে দীর্ঘ অপেক্ষা থেকে শুরু করে আকাশে উড়োজাহাজের বাড়তি ট্রাফিক সব মিলিয়ে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছে দেশের প্রধান এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায় নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনাকারী ৩৮টি বিদেশি এয়ারলাইনসের অতিরিক্ত ফ্লাইটের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। একই কারণে ঢাকায় নতুন করে ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহী আরও ১২টি এয়ারলাইনসকেও আপাতত অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।
শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। বিপরীতে বর্তমানে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৫৯ শতাংশ বেশি যাত্রীকে সেবা দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন যেখানে গড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ছিল, সেখানে বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিলিয়ে ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করছেন।
অতিরিক্ত এই চাপের প্রভাব পড়ছে বিমানবন্দরের প্রায় প্রতিটি সেবায়। ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, লাগেজ হ্যান্ডলিং ও বোর্ডিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও ধীরগতি। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি স্বাভাবিক পরিচালন ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
চাপ রয়েছে বিমানবন্দরের এয়ারসাইডেও। বর্তমানে শাহজালালে সচল রানওয়ে রয়েছে মাত্র একটি। এই রানওয়ে দিয়েই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০টি ফ্লাইট ওঠানামা করছে। ব্যস্ত সময়ে উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য উড়োজাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে বাড়তি ট্রাফিক চাপ। ফলে বিমানবন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর আগ্রহও বাড়ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদাকে কাজে লাগাতে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, সাউদিয়া, ফ্লাইদুবাই ও কুয়েত এয়ারওয়েজসহ বিভিন্ন বিদেশি ক্যারিয়ার নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।
পিক সিজন কিংবা অফ-পিক বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ও চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি চাইছে এয়ারলাইনসগুলো। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামোর ওপর এই বাড়তি চাপ তৈরি হলে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নির্ধারিত সূচির বাইরে অতিরিক্ত ফ্লাইটের অনুমোদন আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে এভাবে দীর্ঘদিন এয়ারলাইনসগুলোর চাহিদা আটকে রাখা সম্ভব নয়। কারণ একটি দেশের এভিয়েশন বাজারের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিমানবন্দর সক্ষমতা। আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় সমাধান হিসেবে সামনে রয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল।
থার্ড টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হওয়ার কথা। আধুনিক বোর্ডিং ব্যবস্থা, বাড়তি লাগেজ বেল্ট, উন্নত ইমিগ্রেশন সুবিধা এবং বড় পার্কিং সক্ষমতার কারণে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে পুরোনো দুই টার্মিনালের ওপরও চাপ কমবে।
কিন্তু নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও থার্ড টার্মিনাল এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। অপারেশন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে চুক্তিগত জটিলতার কারণে এর পুরোপুরি ব্যবহার শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে প্রস্তুত থাকা নতুন অবকাঠামো এখনও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তবে থার্ড টার্মিনাল চালু করাই শেষ সমাধান নয়। ভবিষ্যতে যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই শাহজালালের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এয়ারসাইড অবকাঠামো সম্প্রসারণ, এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট আধুনিকায়ন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ অন্যান্য সেবার মান উন্নয়ন জরুরি।
বিশ্বের বড় এয়ারলাইনসগুলোর বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের আগ্রহ এবং ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায় বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
