ঢাকায় আসতে চায় ১২ এয়ারলাইন্স, কিন্তু নামার জায়গা নেই!

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ ঘন্টা আগে

বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন ধারণক্ষমতার চরম সংকটে। বিশ্বের একাধিক শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইন্স ঢাকায় ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখালেও রানওয়ে, পার্কিং বে ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত থার্ড টার্মিনাল এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে নতুন এয়ারলাইন্সকে ঢাকায় নামার সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না কেন? আর এত বড় প্রকল্প চালু হতে দেরি হচ্ছে কেন?

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। কিন্তু গত বছর এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন ১ কোটি ২৭ লাখেরও বেশি যাত্রী। অর্থাৎ, সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪৭ লাখ বেশি যাত্রীকে সেবা দিতে হয়েছে, যা প্রায় ৬০ শতাংশ অতিরিক্ত চাপের সমান। এর প্রভাব পড়ছে বিমানবন্দরের প্রায় প্রতিটি সেবায়। ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, ট্রলি, বোর্ডিং ও ব্যাগেজ সংগ্রহ সব ক্ষেত্রেই যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

শুধু টার্মিনাল নয়, চাপ রয়েছে রানওয়েতেও। একটি মাত্র রানওয়ে ব্যবহার করে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০টি বাণিজ্যিক, কার্গো ও সামরিক ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি চলাচল করছে প্রায় ৪০টি হেলিকপ্টার। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, এয়ার কানাডা, এয়ার ফ্রান্স, সুইস, উইজ এয়ার, রয়্যাল এয়ার মারোকসহ অন্তত ১২টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ঢাকায় ফ্লাইট চালাতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাদের আবেদন অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকায় নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ফ্লাইটের অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, যাত্রী আছে, বাজার আছে, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের আগ্রহও রয়েছে কিন্তু তাদের জন্য ঢাকার আকাশে পর্যাপ্ত জায়গা নেই।

বিকল্প হিসেবে নতুন এয়ারলাইন্সগুলোকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানযাত্রার সবচেয়ে বড় বাজার এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে বিশ্বের বড় এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য চট্টগ্রাম বা সিলেট দিয়ে এই বাজারে প্রবেশ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় সমাধান হতে পারে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। এটি চালু হলে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হওয়ার কথা। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতাও। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হলেও পরিচালনা ব্যবস্থা চূড়ান্ত না হওয়া, জাপানি অপারেটর কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখনও এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টার্মিনাল চালু না হলেও প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। গত জুন থেকেই প্রকল্পের ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধ করছে বেবিচক, অথচ যাত্রীরা এখনও নতুন টার্মিনালের সুবিধা পাচ্ছেন না।

ফলে একদিকে নতুন এয়ারলাইন্স বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও সীমিত থাকছে। এতে আসনসংখ্যা বাড়ছে না, টিকিটের দামেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।

বিশ্বের শীর্ষ এয়ারলাইন্সগুলো যখন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান এভিয়েশন বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায়, তখন দেশের প্রধান বিমানবন্দরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় বাধা। এখন সবার নজর এক প্রশ্নে ২২ হাজার কোটি টাকার থার্ড টার্মিনাল কবে পুরোপুরি চালু হবে? কারণ এর দরজা না খুললে শুধু একটি টার্মিনালই বন্ধ থাকবে না, আটকে থাকবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতে নতুন প্রতিযোগিতা ও সম্ভাবনার দুয়ারও।

  • শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর