২ কোটি যাত্রী, কিন্তু রানওয়ে ১টি! কীভাবে চলবে থার্ড টার্মিনাল?

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ ঘন্টা আগে

২২ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। ২১ লাখ বর্গফুটের বিশ্বমানের অত্যাধুনিক টার্মিনাল। বছরে প্রায় দুই কোটি যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা। সবকিছুই প্রস্তুত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালকে ঘিরে। কিন্তু এই বিশাল অবকাঠামোর বিপরীতে বিমানবন্দরের রানওয়ে সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।

বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ও একটি রানওয়ে দিয়ে বছরে প্রায় সোয়া কোটি যাত্রী পরিবহন করা হয়। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা বেড়ে প্রায় দুই কোটিতে পৌঁছাবে। একই সঙ্গে বাড়বে কার্গো পরিবহনের সক্ষমতাও। তবে পুরো বিমানবন্দরকে এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে একটি কার্যকর রানওয়ের ওপর।

এই রানওয়ে দিয়েই প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা করে। ব্যস্ত সময়ে ঢাকার আকাশে বিমানজট তৈরি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। রানওয়ে ব্যবহারের অপেক্ষায় অনেক উড়োজাহাজকে আকাশে চক্কর দিতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফ্লাইট বিলম্ব এবং যাত্রী ভোগান্তিও বাড়ে।

থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের যাত্রী ও ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে রানওয়ের ওপর চাপও বাড়বে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়লেও রানওয়ের সীমাবদ্ধতা কি শেষ পর্যন্ত পুরো বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

সমাধান হিসেবে সামনে আসে দ্বিতীয় রানওয়ের বিষয়টি। কিন্তু শাহজালালে একটি স্বাধীন দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণ করা সহজ নয়। একই সময়ে স্বাধীনভাবে বিমান ওঠানামা করানোর জন্য দুটি রানওয়ের মধ্যে নির্দিষ্ট নিরাপদ দূরত্ব প্রয়োজন। বর্তমান বিমানবন্দরের আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সেই জায়গা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন রানওয়ে নির্মাণ করতে হলে বিমানবন্দরের আশপাশের বিস্তৃত এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হবে। ফলে প্রকল্পটি শুধু ব্যয়বহুল নয়, সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবেও অত্যন্ত কঠিন।

এর সঙ্গে রয়েছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা অঞ্চলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনাও। উড্ডয়ন ও অবতরণের পথে নির্ধারিত উচ্চতা-সীমা অতিক্রম করা ভবন নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এসব স্থাপনা অপারেশনাল নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে থার্ড টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা নেই। নতুন টার্মিনাল চালু হলে চেক-ইন, ইমিগ্রেশন, বোর্ডিং, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং ও যাত্রীসেবার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। যাত্রীদের জন্য তৈরি হবে আধুনিক ও উন্নত সেবার পরিবেশ।

কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা শুধু টার্মিনাল ভবনের ওপর নির্ভর করে না। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, এপ্রোন, এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট এবং গ্রাউন্ড অপারেশন—সবকিছুর সমন্বিত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে একটি বিমানবন্দর কতগুলো ফ্লাইট কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবে।

ভবিষ্যতে ফ্লাইটের সংখ্যা দ্রুত বাড়লে একটিমাত্র রানওয়ে শাহজালালের অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতায় পরিণত হতে পারে। বাড়তে পারে আকাশে হোল্ডিং, ফ্লাইট বিলম্ব, জ্বালানি অপচয় এবং এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয়।

এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের ওপর নির্ভর না করে রাজধানীর বাইরে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা বিকল্প এভিয়েশন হাব তৈরির পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামী কয়েক দশকের যাত্রী ও ফ্লাইটের চাহিদা পূরণ করতে হলে প্রয়োজন হবে সমন্বিত ও ভবিষ্যৎ উপযোগী বিমানবন্দর অবকাঠামো।

থার্ড টার্মিনাল বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে টার্মিনালের পাশাপাশি রানওয়ে, এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অপারেশনাল সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায় তার ওপর।

  • থার্ড টার্মিনাল
  • হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর