সড়ক পরিবহনের দিকে তাকালে বাস্তবতা অনেক ভয়াবহ। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও মহাসড়কগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। অথচ বিমান চলাচলে প্রতিটি ফ্লাইট পরিচালনার আগে আবহাওয়া, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পাইলটের প্রস্তুতি, রানওয়ের নিরাপত্তা এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের অনুমোদনসহ বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়।
রেল ও নৌপরিবহন তুলনামূলক নিরাপদ হলেও সেখানেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও মানবিক ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বিমান পরিবহনে একটি ছোট ত্রুটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক বিমানে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে, যেকোনো যান্ত্রিক সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একইসঙ্গে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।
আকাশপথ নিরাপদ হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো আন্তর্জাতিক নজরদারি। বিশ্বের প্রতিটি দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে পরিচালিত হতে হয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর গভীর তদন্ত ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্কার। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিমান, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সার্বক্ষণিক নজরদারি, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে পাইলটের লাইসেন্স নবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় কঠোর তদারকির আওতায় থাকে। ফলে এখানে দায়িত্বহীনতার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
তবে এটাও সত্য যে, বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব অনেক বেশি আলোচিত হয়। কারণ একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে বহু মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে এবং ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হয়। ফলে মানুষের মনে ভয় তৈরি হয় যে বিমান ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ। বাস্তবে কিন্তু পরিসংখ্যান উল্টো চিত্র তুলে ধরে। একজন মানুষ সড়কপথে প্রতিদিন যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন, আকাশপথে সেই ঝুঁকি বহুগুণ কম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আকাশ পরিবহনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। দেশের অর্থনীতি, পর্যটন, প্রবাসী যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিরাপদ ও আধুনিক বিমান পরিবহন একটি দেশের উন্নয়ন সক্ষমতার প্রতীকও বটে। তাই এই খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দর আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আকাশপথ আরও নিরাপদ ও বিশ্বমানের হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, আবেগ বা আতঙ্ক নয়—তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই পরিবহন নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সামগ্রিক পরিসংখ্যানই বাস্তবতা তুলে ধরে। আর সেই বাস্তবতা বলছে—আকাশ পরিবহন কেবল দ্রুতগতির নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা। তাই নিরাপদ ভ্রমণের আস্থায় আকাশপথ আজও আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন।
লেখকঃ মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট



