আকাশপথে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ হারাচ্ছে যশোর?

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ ঘন্টা আগে

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর যশোর। আধুনিক টার্মিনাল ভবন, সম্প্রসারিত রানওয়ে এবং আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো—সবকিছু মিলিয়ে কয়েক বছর আগেও এই বিমানবন্দরকে ঘিরে ছিল বড় স্বপ্ন। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। একসময় যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকা যশোর বিমানবন্দর এখন ফ্লাইট সংকট ও যাত্রী স্বল্পতার কারণে অনেকটাই নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

একসময় ঢাকা-যশোর রুটে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৮টি ফ্লাইট পরিচালিত হতো। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন করা এই বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি ধারাবাহিক লোকসান ও যাত্রী সংকটের কারণে যশোর রুটে তিন মাসের জন্য সব ধরনের ফ্লাইট স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এর আগেই নভোএয়ার এই রুট থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সপ্তাহে মাত্র দুই দিন—মঙ্গলবার ও শুক্রবার ঢাকা-যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যশোর রুটে যাত্রী কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন। সড়কপথে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অনেক যাত্রী এখন বিমান ভ্রমণের পরিবর্তে বাস কিংবা ট্রেনকে বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে আধুনিক আন্তঃনগর ট্রেনের মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় আকাশপথের ওপর নির্ভরতা অনেক কমেছে।

অন্যদিকে বিমান ভাড়াও যাত্রীদের জন্য একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-যশোর রুটে একমুখী বিমান ভাড়ার সর্বনিম্ন মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। যেখানে উন্নতমানের এসি বাসে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যেই একই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। ফলে মাত্র ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটের জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

ফলে অর্ধেকের বেশি আসন খালি রেখে প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনা করা বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য আর অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকছে না। এ কারণেই একের পর এক এয়ারলাইন্স যশোর রুট থেকে সরে যাচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ঢাকা-যশোর যাত্রী পরিবহনের ওপর নির্ভর করে এই বিমানবন্দরকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যশোর অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ ফুল, সবজি ও চিংড়ি উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ায় বিমানবন্দরটিকে একটি কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপে কৃষিপণ্য ও সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা গেলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যেতে পারে।

একই সঙ্গে যশোর থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার কিংবা আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে যাত্রী ও কার্গো দুই খাতেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, যশোর বিমানবন্দর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক পরিকল্পনা ও রুট বৈচিত্র্য আনা গেলে এটি আবারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশপথের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত এই অবকাঠামো ধীরে ধীরে ব্যবহারহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

  • যশোর বিমানবন্দর