বাংলাদেশের আকাশে কার্যত অবাধ বিচরণ করছে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলো। ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে চলাচলকারী শত শত ফ্লাইট নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করছে, ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বড় সুবিধা পাচ্ছে তারা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০টির মতো ভারতীয় ফ্লাইট ঢাকার ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়ন (এফআইআর) ব্যবহার করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) নির্ধারিত ‘ওভার ফ্লাইং রাইট’ অনুযায়ী এক দেশের উড়োজাহাজ অন্য দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারে। নিরাপত্তাজনিত কারণ ছাড়া এ ব্যবহারে বাধা দেওয়া যায় না। তবে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আগাম অনুমতি নিয়ে উড়োজাহাজের ধরনভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত নেভিগেশন চার্জ পরিশোধ করতে হয়। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট দেশের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কর্তৃপক্ষ ফ্লাইটকে নিরাপদে আকাশসীমা পারাপারে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের আকাশ ব্যবহার করে ভারতের কলকাতা, শিলং, গুয়াহাটি, আগরতলা ও ইম্ফলগামী ফ্লাইটগুলো উল্লেখযোগ্য দূরত্ব কমিয়ে আনছে। উদাহরণ হিসেবে, কলকাতা থেকে গুয়াহাটির স্বাভাবিক দূরত্ব প্রায় ১,০১৮ কিলোমিটার, যেখানে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টার মতো। কিন্তু বাংলাদেশের আকাশ ব্যবহার করলে দূরত্ব কমে প্রায় ৫১৯ কিলোমিটার এবং সময় নেমে আসে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টায়। এ রুটে প্রতিদিন স্পাইসজেট, ইন্ডিগো, এয়ার ইন্ডিয়া, ভিস্তারা ও এয়ার এশিয়া ইন্ডিয়ার একাধিক ফ্লাইট চলাচল করছে।
একইভাবে কলকাতা-আগরতলা রুটে দূরত্ব কমেছে প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার। কলকাতা-ইম্ফল রুটেও প্রায় ১,৫০৭ কিলোমিটারের বদলে মাত্র ৬২০ কিলোমিটার উড়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে জ্বালানি ব্যয় কমছে, ফ্লাইট সময় হ্রাস পাচ্ছে এবং পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হচ্ছে।
দূরত্ব কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ভাড়াতেও। আগে আগরতলা হয়ে দিল্লি যেতে যেখানে ১২-১৩ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তা নেমে এসেছে ৫-৬ হাজার টাকায়। আগরতলা-চেন্নাই রুটে ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১১-১২ হাজার টাকায়। এতে ভারতীয় যাত্রীরা সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হচ্ছে? নেভিগেশন চার্জ বাবদ আয় হওয়ার কথা থাকলেও সব এয়ারলাইন্স নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বড় উদাহরণ স্পাইসজেট। এয়ারলাইন্সটির কাছে নেভিগেশন চার্জ বাবদ প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। মাসে ১ লাখ ডলার পরিশোধের সমঝোতা থাকলেও ২০২৪ সালের মার্চের পর থেকে আর কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। ফলে সম্প্রতি স্পাইসজেটকে বাংলাদেশের আকাশে ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
অন্য ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোর বকেয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ না হলেও, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশ ব্যবহার করায় আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশসীমা ব্যবহারের সুবিধা যেমন আন্তর্জাতিক প্রটোকলের অংশ, তেমনি প্রাপ্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিষয়।
