বাংলাদেশের আকাশ পরিবহন ও ইউএস-বাংলার পথচলা

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ-বাংলাদেশ। যার মধ্যে প্রায় ১.৫ কোটি জনসংখ্যা প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। এছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠী সারা বছর কাজের প্রয়োজনে, চিকিৎসার প্রয়োজনে, শিক্ষার প্রয়োজনে, ব্যবসার প্রয়োজনে কিংবা পর্যটকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

আন্তর্জাতিক রুটের মার্কেট শেয়ারের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে আর দেশীয় এয়ারলাইন্সের কাছে মাত্র ২০ শতাংশ যা এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য চিন্তার বিষয়। মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশে জিডিপি’র কন্ট্রিবিউশন ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬/৭ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিকভাবে সুদৃঢ় অবস্থানে পৌছাতে এ খাত অন্যতম ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের প্রায় ৫৪টি দেশের সাথে এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্ট আছে অথচ বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলো মাত্র ২০/২১টি দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আমাদের সক্ষমতার অভাবের কারণে অবশিষ্ট দেশগুলোর সাথে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর মাধ্যমে আকাশপথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

স্বাধীনতার পর আজ ৫৪ বছর অতিক্রম করছে বাংলাদেশ অথচ আমাদের জাতীয় বিমান সংস্থা সঠিকভাবে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, এটা আমাদের চরম ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক রুটের মার্কেট শেয়ার প্রতি মুহূর্তে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

আজ প্রায় ২৯ বছর যাবত দেশের আকাশপথে জাতীয় বিমান সংস্থার সাথে বেসরকারি বিমান সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনা করছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বিগত সময়গুলোয় প্রায় ৮/৯টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এ খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ আশার পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়ে আছে। বর্তমানে জাতীয় বিমান সংস্থার সাথে মাত্র তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রা আকাশ পথে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করতে হলে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। এয়ারলাইন্সগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের এ্যারোনোটিক্যাল, নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ, সারচার্জগুলো অবশ্যই যৌক্তিক হারে নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিমানবন্দরের বিভিন্ন ট্যাক্স নির্ধারণ করলে যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই থেকে দুটি ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট-এর মাধ্যমে ঢাকা-যশোর আর আর ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বহরে ২৫টি এয়ারক্রাফট রয়েছে এবং ১০টি দেশের ১৪টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যসহ দেশের অভ্যন্তরে সব রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

ইউএস-বাংলা যাত্রার শুরু থেকেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যাত্রীদের কাছে ইউএস-বাংলার রয়েছে বাস্তবমুখী কমিটমেন্ট, অন-টাইম ফ্লাইট ডিপার্চার, ইন-ফ্লাইট সার্ভিস, দ্রুততম সময়ে লাগেজ ডেলিভারিসহ নানাবিধ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

সর্বোপরি বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেই দিকে নজর দিচ্ছে ইউএস-বাংলা।

ইউএস-বাংলার চলার পথ ছিল অম্ল-মধুর সম্পর্কের মতো বিশেষ করে চলার পথটি ছিল বন্ধুর। স্বল্প সময়ের যাত্রা পথে ইউএস-বাংলাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে করোনা মহামারির মতো দুর্যোগ। জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য এভিয়েশন ব্যবসাকে নাভিশ্বাস করে তুলেছে। অভিজ্ঞ পাইলট, ইঞ্জিনিয়ারের অভাবে সেক্টরের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার ওপর সরকারের নানাবিধ পলিসির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা কারণে পূর্বে অনেকগুলো এয়ারলাইন্স বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। অতিরিক্ত চার্জ বা সারচার্জ কিংবা জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মহলকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। যাতে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ আর সম্মানিত যাত্রী সাধারণ উভয়েই উপকৃত হয়।

রেগুলেটরি অথরিটি কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই বিগত দিনে বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দের ব্যাপারে বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সক্ষমতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। সর্বোপরি যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে অবশ্যই লেবেল প্লেয়িং ফিল্ডকে বিবেচনায় রাখতে হবে।

শতভাগ বাংলাদেশি যাত্রীদের ওপর ভিত্তি করে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এদেশের আকাশ পরিবহনে ব্যবসা পরিচালনা করছে। দিন যত যাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর আন্তর্জাতিক রুটের মার্কেট শেয়ার নিয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাব।

বাংলাদেশের চারটি এয়ারলাইন্স এর নিকট সর্বসাকুল্যে রয়েছে মোট ৫৪টি এয়ারক্রাফট যা দিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সহস্রাধিক এয়ারক্রাফট এর সাথে প্রতিযোগিতা করছে যা কোনোভাবেই সামঞ্জস্য নয়। ফলে নতুন নতুন বিদেশি এয়ারলাইন্স এদেশে ব্যবসা করার জন্য আসছে আর দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো আন্তর্জাতিক রুটের মার্কেট শেয়ার হারাচ্ছে।

ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারকদের ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দের ব্যাপারে আরও সচেতন হতে হবে যাতে দেশি বিমান সংস্থার ভবিষ্যৎ হুমকির মধ্যে না পড়ে। দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো অন্যান্য দেশের মতো টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও দেশীয় এয়ারলাইন্স-এর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

এ্যারোনোটিক্যাল, নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ, সারচার্জ, জেট ফুয়েলের ঊর্ধ্বমূল্য, যৌক্তিক উপায়ে ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ, দেশীয় এয়ারলাইন্স-এর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলের জন্য জেট ফুয়েলের মূল্য সমহারে নির্ধারণ করতে হবে।

সর্বোপরি দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোকে প্রায়োরিটি দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পথকে সহজ করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরী বলেই মনে হচ্ছে। নতুবা বিগত দিনের মতো বন্ধ হওয়ার মিছিলটি আরও বেশি লম্বা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবতার নিরিখে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স যাত্রার শুরুতে পরিকল্পনা ছিল যেসব দেশে বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইবোনদের অবস্থান সেখানে তাদের সেবার হাত বাড়িয়ে দেবে সর্বপ্রথম। তারই ধারাবাহিকতায় ইউএস-বাংলা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গন্তব্য জেদ্দা, রিয়াদ, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, দোহা, মাস্কাট এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, মালদ্বীপে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

  • Travel based 1st digital media
  • আকাশপথ
  • ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স
  • ভ্রমণ বিষয়ক প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া