২০১০ সালে বাংলাদেশের কর্পোরেট ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র এয়ারলাইন্স হিসেবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। কোনো একক শিল্পগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে দেশের লাখো বিনিয়োগকারীর অর্থ ও প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে যায় এয়ারলাইন্সটির ভবিষ্যৎ।
শুরু থেকেই দ্রুত সম্প্রসারণের পথে হাঁটে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। বহরে যুক্ত হতে থাকে একের পর এক উড়োজাহাজ। অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি ওমান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অন্যতম বড় বেসরকারি এয়ারলাইন্সে পরিণত হয় প্রতিষ্ঠানটি।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরীর উদ্যোগে। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ২০০৭ সালের ১০ জুলাই একটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ দিয়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু করে তারা। একপর্যায়ে বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে।
কিন্তু ব্যবসার এই সম্প্রসারণের আড়ালেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে বড় সংকট। ২০১৪ সালের দিকে পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ্যে আসে। এর প্রভাব পড়ে ফ্লাইট পরিচালনায়। শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি একপর্যায়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিন দিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির ফ্লাইট কার্যক্রম।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক ও পরিচালনাগত সংকট। উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ এবং নিয়মিত অপারেশন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। একের পর এক উড়োজাহাজ অচল হয়ে যাওয়ায় কমতে থাকে সচল বহর। বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে প্রতিষ্ঠানটির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে দেনার বোঝায়। বেবিচকের কাছে পার্কিং, ল্যান্ডিং ও সারচার্জ বাবদ বকেয়া কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ব্যাংকের কাছেও তৈরি হয় বড় অঙ্কের দায়। ফলে উড়োজাহাজ সচল রাখা এবং নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট আরও তীব্র হয়।
অবশেষে ২০১৬ সালের ৫ মার্চ ‘এয়ারক্রাফট সংকট’ ও ‘আর্থিক সমস্যা’র কথা জানিয়ে সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। একসময় যে প্রতিষ্ঠান ১১টি উড়োজাহাজ নিয়ে দেশের বেসরকারি এভিয়েশনের শীর্ষে উঠে এসেছিল, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তার পুরো কার্যক্রম থেমে যায়।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসি পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে এয়ারলাইন্সটি সচল করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট ও দীর্ঘদিনের আর্থিক জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগও সফল হয়নি।
ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত বেসরকারি এয়ারলাইন্সের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বড় এক আর্থিক বিপর্যয়ে। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পতন দেখিয়ে দিয়েছে শুধু উড়োজাহাজের বহর বাড়ালেই একটি এয়ারলাইন্স টেকসই হয় না, প্রয়োজন শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ পরিচালনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা।
