১৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ হিসেবে স্বীকৃতি পেল কক্সবাজার বিমানবন্দর। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা পেল কক্সবাজার।
৬ হাজার কোটি টাকায় তিন প্রকল্প
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে তিনটি প্রকল্পে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯ সালে নেওয়া প্রথম প্রকল্প ছিল ‘কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’। যার ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ১৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে শুরু হয় আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ প্রকল্প, যার ব্যয় ২৭৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১৯ সালে নেওয়া ‘রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের’ ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা।
সাগরের বুকে দীর্ঘতম রানওয়ে
এই বিমানবন্দরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর রানওয়ে। ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট দৈর্ঘ্যের রানওয়েটি সম্প্রসারণ করে এখন করা হয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট, যার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট নির্মিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের বুকের ওপর। এছাড়া সাগরের নীল জলরাশির উপর প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে বসানো হয়েছে অ্যাপ্রোচ লাইট, যা বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নের সময় এক বিশেষ দৃশ্য তৈরি করবে। এটি চালু হলে এটিই হবে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে।
ঝিনুক আকৃতির টার্মিনাল ভবন
প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট আয়তনের আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবনটি নির্মিত হচ্ছে ঝিনুক আকৃতিতে, যা একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। টার্মিনাল ভবনটির কাজ প্রায় শেষের পথে। বছরে প্রায় ১৮ লাখ যাত্রী সেবা নিতে পারবেন এখান থেকে। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি ফ্লাইট ওঠানামা করার সক্ষমতাও থাকবে এই বিমানবন্দরের।
চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট
প্রজ্ঞাপন জারির ফলে কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর আর কোনো বাধা নেই। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রথমে ঢাকা-কক্সবাজার-কলকাতা রুটে ফ্লাইট চালু করার পরিকল্পনা করছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ঢাকা-কক্সবাজার-ব্যাংকক রুটে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসেই চালু হতে পারে ফ্লাইট।
বিদেশি এয়ারলাইন্সের আগ্রহ
চীনের কুনমিং রুটে ফ্লাইট চালাতে আগ্রহ দেখিয়েছে একটি চীনা এয়ারলাইন্স। পাশাপাশি এয়ার অ্যারাবিয়া কক্সবাজার থেকে জেদ্দা ও মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যে ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনা করছে। যদিও আলোচনাগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে আগামী বছরের মার্চের মধ্যেই বিদেশি ফ্লাইট চালুর আশা করা হচ্ছে।
পর্যটন ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি পর্যটক আগমন বাড়বে, যা হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতে নতুন গতি আনবে। একইসঙ্গে এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ উন্নয়নে নতুন দিগন্ত খুলে দিবে। এছাড়া এ বিমানবন্দর বাংলাদেশকে ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অপেক্ষা করছে নানা চ্যালেঞ্জ
তবে বিমানবন্দর ঘিরে কিছু সংশয়ও রয়ে গেছে। কক্সবাজার এখনো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। পর্যাপ্ত যাত্রীসংখ্যার ঘাটতি এবং কার্গো ও নিরাপত্তা সুবিধার সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় বাধা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু পর্যটন ও বাণিজ্য নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন এক আঞ্চলিক যোগাযোগ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।
