১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ! তবুও কেন পিছিয়ে বিমান?

লেখক: চেক ইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ ঘন্টা আগে

প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ, আধুনিক উড়োজাহাজের বহর এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজার সব মিলিয়ে সম্ভাবনার দিক থেকে শক্ত অবস্থানেই রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে এত বড় সম্পদভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার নেতৃত্ব এবং বাণিজ্যিক স্বাধীনতার ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে দেশের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনস।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান স্কাইট্র্যাক্সের রেটিংয়ে বিমান এখনও ‘থ্রি-স্টার’ এয়ারলাইনস। যাত্রীসেবার মান গ্রহণযোগ্য হলেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিস, কেবিনের পরিচ্ছন্নতা এবং সেবাকর্মীদের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। ফলে সম্পদের পরিমাণ বড় হলেও সেবার মানে তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থার অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নেতৃত্বের অভাব। প্রতিষ্ঠার পর গত ৫৪ বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে পরিবর্তন এসেছে ৪৪ বার। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতে যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং অনেক ক্ষেত্রে এভিয়েশন খাতে পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ায় রুট সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক কৌশল ও সেবার উন্নয়ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় থাইল্যান্ডের ব্যাংকক এয়ারওয়েজের সঙ্গে তুলনা করলে। স্কাইট্র্যাক্সের ‘ফোর-স্টার’ রেটিং পাওয়া এই এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে ২৩টি সক্রিয় উড়োজাহাজ রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা বিমানের সম্পদের কাছাকাছি। তবে দক্ষ কর্পোরেট পরিচালনা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গত বছর প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অন্যদিকে, বিশাল যাত্রী ও কার্গো বাজার থাকা সত্ত্বেও বিমান এখনও সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।

অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমানের আর্থিক অবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন, কার্গো এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং কার্যক্রম থেকে ৭৮৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি, যা বিমানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে এই মুনাফার পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), পদ্মা অয়েলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক রুট, স্লট এবং উড়োজাহাজ ব্যবহারের দক্ষতার মাধ্যমে এসব দায় সামাল দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী কয়েক বছরে আরও বড় হতে যাচ্ছে বিমানের বহর। সম্প্রতি প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা। পাশাপাশি এয়ারবাস থেকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবও মূল্যায়নাধীন রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বহর বাড়ালেই হবে না নতুন উড়োজাহাজগুলো থেকে লাভজনক পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং নগদ অর্থপ্রবাহ ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিমানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, গত সাত বছরের মধ্যে চার বছর প্রতিষ্ঠানটি লাভ করেছে এবং নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে দেনার পরিমাণও কমানো হচ্ছে। তবে এভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় বাধা এখনও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। বিশ্বের শীর্ষ এয়ারলাইনসগুলো দ্রুত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও শতভাগ সরকারি মালিকানার কারণে বিমানের অনেক সিদ্ধান্ত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় বহর বাড়ানো, সম্পদ বৃদ্ধি কিংবা মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি বিমান কি সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে? নাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতাই ভবিষ্যতেও জাতীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইনসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে?

  • বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স