দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর ফের চালু হতে যাচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ঈশ্বরদী ইপিজেডসহ দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু মেগাপ্রকল্পের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ ও দ্রুততর করতে পরিত্যক্ত এই বিমানবন্দরটি ফের চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি কার্গো বিমান চলাচলের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। এটি চালু হলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে যুক্ত হবে এক নতুন মাত্রা।
পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটির রয়েছে এক সুদীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত এই বিমানবন্দরটি থেকে ১৯৮৯ সালে নিয়মিতভাবে ঢাকায় ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে নানা সংকটের কারণে পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার এর কার্যক্রম চালু এবং বন্ধ হয়। দীর্ঘ বিরতির পর সর্বশেষ ২০১৩ সালে বেসরকারি সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ঈশ্বরদী থেকে তাদের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করলেও, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বছর খানেক পরই তা আবারও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে পড়ে থাকা এই বিমানবন্দরটি আবারও চালুর বড় উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
শুরুতে এই বিমানবন্দরের জন্য মোট ৪৩৬ দশমিক ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে এর আওতাধীন জায়গার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৫ দশমিক ৯১ একরে। এখানে ৪ হাজার ৭০০ ফুট দৈর্ঘ্যের রানওয়ে, টার্মিনাল বিল্ডিং, ভিআইপি লাউঞ্জ, যাত্রীদের অপেক্ষাগার, অফিসারদের আবাসিক এলাকাসহ প্রয়োজনীয় নানা অবকাঠামো থাকলেও দীর্ঘ অযত্ন আর অবহেলায় এর প্রায় সবই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য বর্তমান রানওয়েকে ৬ হাজার ফুটে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল বিল্ডিং নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণের জন্য আধুনিক ফায়ার সার্ভিস স্থাপন এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের প্রয়োজন হবে।
বিমানবন্দরটি থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরত্বেই গড়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় মেগাপ্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই প্রকল্পকে ঘিরে ওই এলাকায় বর্তমানে বসবাস করছেন ১০ হাজারের বেশি রাশিয়ান নাগরিক। এছাড়া এই জেলায় রয়েছে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পদ্মার সুবিশাল চরজুড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বিশাল বাজার। এতসব সম্ভাবনা থাকার পরও শুধুমাত্র সড়কপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ঝামেলাপূর্ণ হওয়ার কারণে অনেকেই এখানে নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ পান না। এই স্থবিরতা কাটাতেই সরকার ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ের পর তৃতীয় বিমানবন্দর হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যেই ঈশ্বরদীকে অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহনের জন্য সম্পূর্ণ সক্ষম করে তোলা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিমানবন্দরটি পুরোদমে চালু হলে পাবনা, নাটোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাথে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ ও দ্রুততর হবে। এর মাধ্যমে কেবল যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিই কমবে না, বরং উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় গতির সঞ্চার হবে।
