জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করলেও আর্থিক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ না করায় এবার সংস্থাটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার পাওনা পরিশোধ করেনি বলে অভিযোগ বেবিচকের। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর ব্যবহার ফি, ভ্যাট ও আয়কর সংক্রান্ত অনিয়ম এবং যাত্রী সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়মিতভাবে সরবরাহ না করার বিষয়টি। এ অবস্থায় আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে বেবিচক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিসাব নিষ্পত্তি না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত প্রতিষ্ঠানটির।
বকেয়া নিয়ে দুই সংস্থার হিসাব ভিন্ন
বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে তাদের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৬৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল বিল রয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকা, ভ্যাট ও আয়কর বাবদ বকেয়া ৫১৬ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছে সময়মতো পরিশোধ না করায় আরোপিত সারচার্জ, যার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দাবি, তাদের হিসাবে বেবিচকের কাছে প্রকৃত বকেয়ার পরিমাণ মাত্র ৩৭১ কোটি টাকা। ফলে দুই সংস্থার হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেবিচক নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে উভয় পক্ষকে সব হিসাব মিলিয়ে বা ‘রিকনসাইল’ করে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
রেকর্ড মুনাফার বছর
এই দেনা-পাওনার টানাপোড়েনের মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তাদের ৫৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ নিট মুনাফা অর্জন করেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লাভ দাঁড়িয়েছে ৯৩৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০২১–২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ লাভ ছিল ৪৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এবারের মুনাফা আগের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।
২০০৭ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের পর গত ১৮ বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যে পরিমাণ লাভ করেছিল, এককভাবে চলতি অর্থবছরেই তার চেয়ে বেশি মুনাফা করেছে জাতীয় পতাকাবাহী এ সংস্থাটি।
আধুনিক বহর ও অপারেশনাল সক্ষমতা
এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিমানের আধুনিক ও শক্তিশালী উড়োজাহাজ বহর। বিদায়ী অর্থবছরে বিমানের বহরে ছিল মোট ২১টি উড়োজাহাজ, যার মধ্যে ১৯টি সম্পূর্ণ নিজস্ব মালিকানাধীন। তাঁদের বহরে রয়েছে বোয়িং ৭৮৭-৮ ও ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারের মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী ও অত্যাধুনিক বিমান যা অপারেশনাল খরচ কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের উন্নত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করছে।
গত এক বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পরিবহন করেছে প্রায় ৩৪ লাখ যাত্রী। পাশাপাশি কার্গো পরিবহনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। মোট ৪৩ হাজার ৯১৮ টন পণ্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহন করেছে সংস্থাটি। এ সময়ে বিমানের গড় সিট পূর্ণ থাকার হার বা কেবিন ফ্যাক্টর ছিল ৮২ শতাংশ।
অবস্থানগত টানাপোড়েন
বিশাল বিমানবহর, রেকর্ড মুনাফা ও যাত্রী পরিবহনের সাফল্যের পরও বকেয়া নিয়ে জটিলতা কাটেনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। বরং এই দেনা-পাওনাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় দুই সংস্থা-বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেবিচকের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
