একসময় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও বিলাসবহুল বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে পরিচিত ছিল রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। করপোরেট যাত্রীদের কাছে ছিল এর বিশেষ চাহিদা। আধুনিক উড়োজাহাজ, উন্নত কেবিন সার্ভিস এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে অল্প সময়েই দেশের এভিয়েশন বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সেই রিজেন্ট এয়ারওয়েজই এখন ইতিহাস। বিমানবন্দরের এক কোণে পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো যেন সাক্ষী হয়ে আছে তাদের পতনের।
রিজেন্ট এয়ারওয়েজের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর। চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী হাবিব গ্রুপের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এয়ারলাইন্সটি শুরুতে ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বহরে যুক্ত হয় বোয়িং ৭৩৭-৭০০ ও ৭৩৭-৮০০ সিরিজের উড়োজাহাজ।
উন্নত কেবিন, বিজনেস ক্লাস সেবা এবং আধুনিক ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে দ্রুতই যাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায় রিজেন্ট। ঢাকা-সিঙ্গাপুর, ঢাকা-কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটে তাদের ফ্লাইটের চাহিদা তৈরি হয়। একপর্যায়ে দেশের বেসরকারি এভিয়েশন খাতে নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পুরো বিশ্বে বিমান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও বন্ধ হয়ে যায় অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। রিজেন্ট এয়ারওয়েজও তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও উড়োজাহাজের লিজ, পার্কিং, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খরচ চলতেই থাকে। একই সময়ে রাজস্ব আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট দ্রুত বাড়তে থাকে। কর্মীদের বেতন-ভাতা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা এবং একপর্যায়ে শ্রমিক অসন্তোষও দেখা দেয়।
করোনার পর বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও রিজেন্ট আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এর পেছনে শুধু মহামারির প্রভাব নয়, মূল প্রতিষ্ঠান হাবিব গ্রুপের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটও বড় ভূমিকা রাখে।
বেবিচকের কাছে ল্যান্ডিং, পার্কিং ও নেভিগেশন চার্জসহ রিজেন্ট এয়ারওয়েজের বকেয়া কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে হাবিব গ্রুপের বিপুল পরিমাণ ঋণ ও দায় জমা হয়। ফলে নতুন করে এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আর্থিক সংকটের পাশাপাশি হাবিব গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি পরিস্থিতিও জটিল আকার ধারণ করে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে গ্রুপটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে রিজেন্ট এয়ারওয়েজকে পুনরায় আকাশে ফেরানোর সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের মার্চে আদালতের আদেশে রিজেন্ট এয়ারওয়েজসহ হাবিব গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থাৎ সম্পদ বিক্রি করে দেনা পরিশোধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসানের পথে নেওয়া হয়।
এভাবেই একসময় দেশের অন্যতম প্রিমিয়াম বেসরকারি এয়ারলাইন্স রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ১৩ বছরের যাত্রার সমাপ্তি ঘটে। তাদের পতন দেখিয়ে দিয়েছে, একটি এয়ারলাইন্সের সাফল্যের জন্য শুধু আধুনিক উড়োজাহাজ, উন্নত সেবা কিংবা শক্তিশালী ব্র্যান্ডই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বড় সংকট মোকাবিলার মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি না থাকলে একটি সফল এয়ারলাইন্সও শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে।
