শুধু থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ করলেই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশের সভাপতি তানজিম আনোয়ার। তাঁর মতে, এভিয়েশন হাব হওয়ার জন্য ভৌগোলিক অবস্থান ও যাত্রী চাহিদার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অবকাঠামো, একাধিক রানওয়ে এবং শক্তিশালী নিজস্ব এয়ারলাইনস থাকা জরুরি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও নির্দিষ্ট যাত্রী বাজার থাকলেও অবকাঠামো এবং বিমান পরিচালনার সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে।
দেশের ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’-এর দশম পর্বে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তানজিম আনোয়ার। অনুষ্ঠানে দেশের এভিয়েশন হাব হওয়ার সম্ভাবনা, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা, থার্ড টার্মিনাল, কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
তানজিম আনোয়ার বলেন, এভিয়েশন হাব হওয়ার জন্য চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো ভৌগোলিক অবস্থান, নির্দিষ্ট যাত্রী চাহিদা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং শক্তিশালী নিজস্ব এয়ারলাইনস। প্রথম দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশে বসবাসরত প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশিকে দেশের একটি বড় যাত্রী বাজার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ নিয়মিত দেশে যাতায়াত করেন। তবে এই যাত্রীদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি এয়ারলাইনসের মাধ্যমে ভ্রমণ করেন। ফলে নিজস্ব এয়ারলাইনসের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এই যাত্রী বাজারের বড় অংশ ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে।
তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি রানওয়েকে এভিয়েশন হাব হওয়ার পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন তানজিম আনোয়ার। তিনি বলেন, বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ হলেও গত বছর সেখানে প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ যাত্রী চলাচল করেছেন। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। একক রানওয়ের কারণে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি বলেন, কলকাতা, দিল্লি, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবগুলোতে একাধিক রানওয়ে রয়েছে। একটি রানওয়ে দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা থাকে। তাই বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ঢাকার আশপাশে অন্তত দুটি রানওয়েসহ একটি বড় বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নিতে হবে। বর্তমান শাহজালাল বিমানবন্দরের আশপাশে দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া কঠিন। এ কারণে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন তানজিম আনোয়ার। তাঁর মতে, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা গেলে ভালো ফল পাওয়ার সুযোগ থাকত। তবে জাপানের সঙ্গে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্পের অর্থায়নসহ বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি আলোচনা করতে হবে। পরিচালনাগত সক্ষমতার ঘাটতি থাকায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে হচ্ছে। থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের পরও দীর্ঘদিন চালু করতে না পারায় ঋণের সুদ পরিশোধের পাশাপাশি সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিকীকরণ নিয়েও নিজের মত তুলে ধরেন এই সাংবাদিক। তিনি বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণ করলেই সেখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আসবে না। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পর্যটন প্যাকেজ, হোটেল, পরিবহন, নিরাপত্তা, বিপণন এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গোয়া, পাতায়া, ফুকেট ও বালির মতো পর্যটন গন্তব্যগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা করেন তানজিম আনোয়ার। তিনি বলেন, বিমানকে কখনোই পুরোপুরি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক ও জনপ্রিয়তানির্ভর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বাণিজ্যিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে হবে। একটি এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ কেনার আগে সম্ভাব্য রুট, যাত্রী চাহিদা, আসনপ্রতি আয়, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিচালন ব্যয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এসব বিষয় বিবেচনা না করে উড়োজাহাজ কেনা হলে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এভিয়েশন সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন প্রসঙ্গে তানজিম আনোয়ার বলেন, এভিয়েশন ও পর্যটন অত্যন্ত বিশেষায়িত সাংবাদিকতার ক্ষেত্র। এ বিষয়ে কাজ করতে হলে সাংবাদিকদের উড়োজাহাজ, রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, ল্যান্ডিং গিয়ার, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এবং বিমানবন্দরের পরিচালনাব্যবস্থা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকতে হবে। এভিয়েশন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভুল তথ্য ও অতিরঞ্জিত শিরোনাম দেশের এভিয়েশন খাতের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সংবাদমাধ্যমগুলোতে এ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
পডকাস্টের শেষ পর্যায়ে এভিয়েশন খাতের বড় দুর্বলতা হিসেবে ব্যবস্থাপনা ও সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন তানজিম আনোয়ার। তাঁর মতে, বাংলাদেশে এভিয়েশন হাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ জন্য ঢাকার আশপাশে বড় বিমানবন্দর নির্মাণ, দেশীয় এয়ারলাইনসের বিকাশে নীতিগত সহায়তা এবং বেবিচকের নিরাপত্তা ও তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
দেশের ভ্রমণবিষয়ক ডিজিটাল মিডিয়া ‘চেক ইন’-এ প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত হয় ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির প্রথম পলিসি পডকাস্ট ‘চেক ইন বাংলাদেশ’। পডকাস্টটির পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা করেন চেক ইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাঈম আবির। প্রযোজনা করেন শাহানুর রহমান মুকুট। অনুষ্ঠানটির হসপিটালিটি পার্টনার ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার।
