হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে জাপানের একটি কনসোর্টিয়াম। তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় উঠে এসেছে একটি শর্ত, যা দেশের ভবিষ্যৎ বিমান চলাচল অবকাঠামো পরিকল্পনা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আগামী ১৫ বছর অন্য কোনো বেসামরিক বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা যাবে না।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালন চুক্তির কারণে দেশের ভবিষ্যৎ বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা কেন সীমাবদ্ধ থাকবে? একই সঙ্গে সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-আসলেই কি ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে?
২০২৫ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী। অথচ বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। ২০৩৫ সাল নাগাদ এই যাত্রীসংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ২ কোটিতে উন্নীত হবে। অর্থাৎ নতুন টার্মিনাল চালুর পরও আগামী এক দশকের মধ্যে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া শাহজালাল বিমানবন্দরের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা একক রানওয়ে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ ওঠানামা করায় রানওয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। আধুনিক ট্যাক্সিওয়ে ও পরিচালনব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হলেও একটি রানওয়ের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা থেকেই যাবে। এসব বাস্তবতায় ভবিষ্যতে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বারবার সামনে আসছে।
তবে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা থাকলেই ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে সেটি নির্মাণ করতে হবে, এমন নয়। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ, জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত সমীক্ষা, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শাহজালালের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে কমপক্ষে ২ হাজার একর জমির প্রয়োজন হতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার আশপাশে এত বিপুল পরিমাণ উপযুক্ত জমি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে জনবসতি, পরিবেশগত প্রভাব এবং জমি অধিগ্রহণের বিপুল ব্যয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো দেশে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিকল্পনা প্রণয়ন, জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে কমপক্ষে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। এর বাইরে ঢাকার আশপাশে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে সরকারের আগে থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও ছিল না। ফলে এখনই ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কতটা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে মূল উদ্বেগের জায়গাটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। আজ হয়তো নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য জমি কিংবা অর্থায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। কিন্তু আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের চাহিদা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। বর্তমানে যে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা দেখা যাচ্ছে না, ভবিষ্যতে সেটিই জাতীয় অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় একটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দরের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় দেশের ভবিষ্যৎ বিমান চলাচল পরিকল্পনা কতটা সীমাবদ্ধ করা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যদি নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্রের করণীয় কী হবে? থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তিতে এমন কোনো শর্ত থাকা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতের জাতীয় অবকাঠামো পরিকল্পনা গ্রহণে রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে অযথা সীমিত করে।
